জান্নাতী রমণী [ পর্ব -০২ ] Jannati Romoni Chapter -2

 আসসালামু আলাইকুম  প্রিয় দীনি ভাই ও বোন। জান্নাতী রমণী দের নিয়ে ধারাবাহিক পর্বে আজ আমরা জানব "হযরত আমেনা (রাঃ)" এর জীবনী। পর্ব -০২ 




বিবাহের সংকেত

এতদিন কিশােরী আমেনা যুবতীতে পরিণত হয়েছেন। তাঁর বিবাহের বয়স দ্বারস্থ হয়েছে। সুতরাং বিবি আমেনা এখন পূর্ণ বিবাহযােগ্য। আরবের সে বর্বর বা পাশব যুগের ঘটনা ইতােপূর্বেই আমরা উল্লেখ করেছি। সে যুগে তথায় কোন গৃহে বিবাহযােগ্য কন্যা থাকা যে কত বড় সমস্যার কথা ছিল তা ভাষায় প্রকাশ করা দুঃসাধ্য ব্যাপার। তদুপরি যদি কন্যা সুন্দরী হত তবে তাে আর কথাই ছিল। ঐ কন্যার পিতা-মাতার উপরে নেমে আসত ভীষণ অশান্তি ও দুশ্চিন্তার অভিশাপ।


 ভয়-ভীতি ও শত দুর্যোগ-দুর্বিপাকের ঝামেলা এসে উপস্থিত হত তাদের উপরে। সে যুগে এ ধরনের কন্যাদের ইজ্জত বা সতীত্ব টিকিয়ে রাখা ছিল কল্পনারও অতীত। যে যুগের বর্বর পুরুষগুলাে শুধুমাত্র জননীকে বাদ দিয়ে কন্যা, ভগ্নি প্রভৃতি প্রায় প্রতিটি নারীর সাথে অবাধে যৌন মিলন ঘটাতে পারত, সে যুগে অন্য নারীরা কেমন করে সে পণ্ড প্রকৃতির পুরুষদের হাত হতে নিজেদেরকে বাঁচিয়ে রাখবে? কিন্তু তখনকার আরবের অবস্থা এ দিক দিয়ে। যতই শােচনীয় হােক না কেন, আল্লাহর সেরা সৃষ্টি নবী-রাসূলের সরদার হযরত আসলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যিনি মাতা হবেন, তার ইজত।


 সম্মান রক্ষার ভার স্বয়ং আল্লাহ তায়ালাই গ্রহণ করেছিলেন। আর এ কারণেই হয়ত আল্লাহ তাকে আরবের অভিজাত কুরায়েশ বংশে প্রেরণ করেছিলেন। এতে ফায়েদা ছিল যে, আরবে ব্যাপক ব্যভিচার থাকা সত্ত্বেও কোন অভিজাত বংশের নারীদের প্রতি অন্যান্য বংশের পুরুষ কিংবা স্ববংশীয় পুরুষেরাও সহজে কুদৃষ্টি প্রদানে সাহসী হত না। বিশেষত বিবি আমেনা তাে ছিলেন মদিনার অতি উচ্চ বংশীয়া নারী। তদুপরি তাঁর জনক ওয়াহাব যুহরী কুরায়েশ সমাজে যথেষ্ট প্রভাব প্রতিপত্তিশালী লােক ছিলেন। 


তাই তার কন্যা আমেনা বিবি যে অতি সহজেই স্বীয় সম্মান রক্ষা করে চলতে পারবেন তাতে আর বিচিত্র কি ? অধিকন্তু বিবি আমেনা শৈশব হতেই নিজে তাে ছিলেন পূতঃ চরিত্র । পবিত্রতা রক্ষার ব্যাপারে চেষ্টা ও যত্নের দিক দিয়ে তাঁর মত মহিলা সে যুগে দ্বিতীয়টি ছিল না বলে অত্যুক্তি হবে না। আল্লাহ্ নিজের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠত্ব রক্ষা এবং তাঁকে নিখুঁত করার উদ্দেশ্যেই বিবি আমেনাকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র এবং নিস্পাপ রেখেছিলেন। আমেনা যৌবনে পৌছা মাত্র পিতা ওয়াহাব যুহরী তাঁকে পাত্রস্থ করার জন্য চেষ্টিত হলেন। 


এ জন্য তার আত্মীয়-স্বজনগণ দেশ-বিদেশে সৎ পাত্র খুঁজতে শুরু করলেন। বহু পাত্রই পাওয়া গেল; অনেক কবিলা হতে সুযােগ্য, উত্তম ও ধন-সম্পদশালী পাত্রের পক্ষ হতে প্রস্তাব জুটল, ওয়াহাব যুহরীর ন্যায় প্রভাবশালী পরিবারের সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করতে অনেকেই আগ্রহ প্রকাশ করল, কিন্তু কোন প্রস্তাবেই যেন কেন কি জানি ওহাব যুহরীর মন ঝুঁকল না। কোন পাত্রেরই ধন-মান-গৌরবে তিনি আকৃষ্ট হলেন না। কোন কোন পাত্রের সপক্ষে ওয়াহাব যুহরীর নিজ আত্মীয়গণ তাঁকে চাপ দিল, সুপারিশ করল কিন্তু তাদের কথাও তিনি মানলেন না। মােটকথা, কন্যা বিবাহ দানের ব্যাপারে কোন এক অজানা পাত্রের দিকে যেন তাঁকে এক অদৃশ্য শক্তি হাতছানি দিচ্ছিল । 


সুতরাং সে সুনির্দিষ্ট পাত্র ব্যতীত অন্য যে কোন পাত্র তার পছন্দই বা হবে কেন, আর তার সাথে নিজের কন্যা বিবাহ দিবেনই বা কিরূপে ? জনশ্রুতি রয়েছে যে, বিবি আমেনা তাঁর পিতাকে বলেছিলেন, পিতঃ! আমি যেখন কোন নির্জন স্থানে যাই তখন অদৃশ্য আওয়াজ। শুনতে পাই কে যেন আমাকে বলে, হে রাসূল জননী! তােমাকে সালাম। আবার। কখনও বা বলে, হে নবীদের সরদারের জননী! তোমাকে সুসংবাদ। সম্প্রতি | একটি নতুন কথা শুনতে পেলাম। ঠিক একইরূপে কে যেন আমাকে বলল, হে  আবদুল্লাহ সহধর্মিনী ! ধন্যবাদ নাও। 


বিবি আমেনার এ কথাগুলাে পিতা ওয়াহাব।যুহরী মনােযােগ সহকারে শুনলেন বটে, কিন্তু এর কোনই গুরুত্ব না দিয়ে আরবের তৎকালীন কুসংস্কার অনুযায়ী একে জ্বিন ও ভূত-প্রেতের কাণ্ডকারখানা মনে করলেন। তাই আর ভবিষ্যতে যাতে এরূপ না হয় তজ্জন্য তিনি অনেক তন্ত্র-মন্ত্র জানা ওঝা-ফকীরদের শরণাপন্ন হলেন। কিন্তু এ সব ব্যবস্থা ও তদবীরাদিতে কোন ফলােদয় হল না; বরং বিবি আমেনাকে কেন্দ্র করে ওয়াহাব যুহরীর গৃহে নানা অলৌকিক ঘটনা ঘটতে লাগল। অবশেষে ওয়াহব যুহরী একদা গভীর রাতে স্বপ্ন দেখলেন যে, এক সম্মানিত পুরুষ তাঁকে বললেন, হে ওয়াহাব! তুমি সাবধান হও। 


তােমার কন্যার উপরে তুমি আর কোন মন্ত্র-তন্ত্র প্রয়ােগ করাে। স্বয়ং আল্লাহ যার তত্ত্বাবধান ও নিরাপত্তার ভার গ্রহণ করেছেন, তুমি তাকে এমন এক উত্তম ও সদ্বংশবান পাত্রের নিকটে সমর্পণ কর, যাকে কোরবানী করার জন্য তাঁর পিতা সংকল্প করেছে এবং আল্লাহ্ও তার কোরবানী মঞ্জুর করেছেন। স্বপ্ন দেখে আবদুল ওয়াহাব যুহরী বিচলিত হয়ে পড়লেন। তিনি বুঝতে পারলেন যে, তা নিশ্চয় স্বপ্ন নয়; বরং স্বপ্নের মাধ্যমে কোন এক সুপ্ত শক্তির কঠোর নির্দেশ। যেভাবে হােক এটা তাকে পালন করতে হবে । 


কিন্তু সমস্যা হল যে, যার দিকে ইঙ্গিত করা হচ্ছে, সে পাত্রটি কে এবং কোথায় ? আর এমন পাত্রকে খুঁজে বের করেই কি লাভ হবে যাকে অবশ্যই কোরবানী করা হবে। তার নিকট কন্যা বিবাহ দিয়ে কন্যার জীবনটাই তাে ব্যর্থ করে দেয়া হবে। এরূপ ভাবনা-চিন্তা।করে কোন কিছু স্থির করতে না পেরে ওয়াহাব যুহরী বিশেষ চিন্তিত অবস্থায়ই কাল কাটাতে লাগলেন।


আবদুল্লাহ্ ও আমেনার শুভ পরিণয়

আবদুল মুত্তালিব ও ওয়াহাব যুহরীর মধ্যে পূর্ব হতেই পরিচয় ছিল। এ পূর্ব পরিচয়ে সূত্র ধরে তাদের মধ্যে আত্মীয়তার সম্পর্কের সূত্রপাত হয়। যদিও তাদের একজন মক্কা ও অন্যজন মদিনার অধিবাসী তবু তারা উভয়ে একই বংশীয় এবং পরস্পর বাল্যবন্ধু ছিলেন । একবার ওয়াহাব যুহরী হজ্জ উপলক্ষে মক্কায় গিয়ে আবদুল মুত্তালিবের সঙ্গে সাক্ষাত করলেন এবং বহুদিন পরে দুই বন্ধুর সাক্ষাত হওয়ায় অনেক বিষয় নিয়ে আলাপ-আলােচনা করলেন। ওয়াহাব যুহরীর মনে এক বিশেষ উদ্দেশ্যও ছিল । 


তিনি তার কন্যার বিবাহ কাজ এখনও পর্যন্ত সমাধান করতে পারেন নি। আবদুল মুত্তালিবের পুত্র কোরবানীর মানত এবং কোরবানী সম্পর্কিত সর্বশেষ ঘটনা সবই তিনি মদিনায় বসেই শুনেছিলেন। তাই তাঁর অন্তর মধ্যে একটি প্রচ্ছন্ন আকাংখাও বিদ্যমান ছিল। তবে তা সরাসরিভাবে প্রকাশ করতে কেন যেন তার সঙ্কোচ হচ্ছিল। তাই তিনি সেরূপ কিছু না বলে প্রকারান্তরে নিজ কন্যা আমেনার কথা উপস্থাপন করলেন। তিনি বললেন, আমার একটি কন্যা বিবাহযােগ্যহয়েছে। তাকে এখন পাত্রস্থ করা দরকার। 


অথচ যােগ্য পাত্র পাওয়া যাচ্ছে না, এ যাবত যেসব প্রস্তাব এসেছে, এর কোনটিই তার মনােমত হয় নেই। শুনে আবদুল।  মুত্তালিব বললেন, তবে তাে ভালই তােমার কন্যাকে না হয় আমার পুত্র। আবদুল্লাহর কাছেই বিবাহ দাও ভাই! আমার কনিষ্ঠ পুত্র আবদুল্লাহর কথা হয়ত। শুনে থাকবে। স্বভাব ও বুদ্ধিমত্তায় সে সবার প্রশংসনীয়। নিজের পুত্রের গুণ। প্রকাশ করা ঠিক নয় বটে, তবু সত্য বলতে আপত্তি কিসের ? আমার পুত্র। তোমার কন্যার জন্য উত্তম পাত্র হবে। 


ইচ্ছা হলে তুমি আমার সাথে বৈবাহিক। সম্পর্ক স্থাপন করতে পার। আবদুল মুত্তালিবের এ বিবাহ প্রস্তাবটি ওয়াহাব যুহরীর কাছে কত যে খুশীর বিষয় ছিল তা ভাষায় প্রকাশ করা অসাধ্য ব্যাপার। তাঁর মনে হতে লাগল যে, নিশ্চয়ই এ স্থানে কন্যা আমেনার বিবাহ হবে এতে কোন সন্দেহ নেই। বিশেষত আবদুল মুত্তালিবের মুখে যখন তিনি শুনলেন যে, তাঁর পুত্রটির নাম আবদুল্লাহ, তখন তিনি সেই কথা স্মরণ করে আরও বেশি আশান্বিত হলেন যে, একদা কন্যা আমেনা বলেছিল, আব্বা!


 আমি যখন কোন নির্জন স্থানে যাই তখন অদৃশ্য হতে কে যেন আমাকে সম্বােধন করে বলে, “হে আবদুল্লাহর সহধর্মিণী, হে রাসূল জননী! তুমি ছালাম গ্রহণ কর। আবদুল মুত্তালিবের এ ছেলেটির নামও আবদুল্লাহ। মােটকথা ওয়াহাব যুহরীর নিকট প্রস্তাবটি সব দিক দিয়েই খুশী ও আনন্দের কারণ হয়েছিল। একে তাে আবদুল মুত্তালিবই মক্কার কুরায়েশদের সরদার, আল্লাহ্র গৃহ খানায়ে কা'বার তত্ত্বাবধায়ক ও বিদেশাগত হজ্জ যাত্রীদের যত্ন ও নিরাপত্তা রক্ষাকারী । তদুপরি তিনি মক্কার সকল কুরায়েশদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা অভিজাত এবং মর্যাদাশালী শাখা হাশেমী গােত্রের লােক। 


এদের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করতে পারা মক্কা ও মদিনার যে কোন কুরায়েশ গােত্রের জন্য গৌরবের কথা। ওয়াহাব যুহরী আর কোনরূপ ইতস্তত বা দ্বিধা না করে আনন্দে আবদুল মুত্তালিবের প্রস্তাব গ্রহণ করলেন। বিবাহের তারিখও তখন নির্ধারিত হল । সে যুগে বিবাহের রীতি ছিল, পাত্র ও পাত্রীর জন্য দেশের শাসক কিংবা কওমের প্রধান সরদারের নিকট হতে বিবাহের অনুমতি গ্রহণ করতে হত। কিন্তু এক্ষেত্রে আবদুল্লাহ ও আমেনার সে রীতি মেনে চলার কোন প্রয়ােজন হল না। কারণ আবদুল্লাহ ছিলেন আবদুল মুত্তালিবের পুত্র এবং তিনিই ছিলেন মক্কার শাসনকর্তা। 


আবদুল্লাহর বিবাহের প্রস্তাব তিনি দিয়েছিলেন এবং ওয়াহাব যুহরী। সাথে সাথে তা গ্রহণও করেছিলেন। সুতরাং রাজা বা শাসকের অনুমতি তাে এ। দু পক্ষের প্রস্তাব ও স্বীকৃতির মধ্য দিয়েই হয়ে গিয়েছিল। তার জন্য অন্য কোনরূপ কিছু করার দরকার ছিল না। অতঃপর নির্দিষ্ট তারিখে উভয় পক্ষের।অভিভাবক ও আত্মীয়-স্বজন মহা ধুমধাম ও আনন্দের সাথে পাত্র-পাত্রী নিয়ে।  আল্লাহর গৃহ খানায়ে কাবায় উপস্থিত হলেন এবং তৎকালের রীতি অনুসারে। দেবতাদের সমক্ষে বিবাহ অনুষ্ঠান সম্পন্ন করলেন। 


এভাবে দেবতাদের সম্মুঙ্গে। এসে বিবাহ অনুষ্ঠান সম্পন্ন করাকে তখন বরকতের নিদর্শন এবং দাম্পত্য পারিবারিক জীবনে পাত্র-পাত্রীর সুখী হবার প্রধান উছিলা হিসেবে মনে করা হত তবে, এ প্রথা কেবল ধনীদের দ্বারাই প্রতিপালিত হত, কারণ এতে ভেজানুষ্ঠান এভূতি বাবত বহু খরচের প্রযােজন হত । এটা গরিবদের পক্ষে সম্ভব হত না। সুতরাং তাদের মধ্যকার বিবাহ অনুষ্ঠানগুলাে রাজার নিকট হতে অনুমতি সংগ্রহের পর পাত্র বা পাত্রীর গৃহে বসেই অনুষ্ঠিত হত। 


বিবাহে তখন মােহরানার বালাই ছিল না, কারণ তখনও পর্যন্ত আরব সমাজে নারীর অধিকার ও মর্যাদা স্বীকৃত হয় নি, তারা তখন পুরুষদের সেবিকা মাত্র ছিল। তাদের ভরণ-পােষণের দায়িত্ব অবশ্য পুরুষ, অথবা নারীদের প্রতি অসহায় ও অবলা হিসেবে তাদের প্রতি কৃপাসুলভ কিছুটা দরদ প্রদর্শনের মত। আসলে যে নারীদের মােহরানার অধিকার, মাতৃ-পিতৃ সম্পত্তির অধিকার বা স্বামীর নিকট খােরাক-পােশাকের তেমন বাধ্যতামূলক অধিকার এ সবের কোন কিছুই তখন ছিল না।


 স্বামী গৃহে আসার পরে নারী স্বামীর নিকট হতে নিয়মিত ভরণ-পােষণ পেত সত্য, কিন্তু তা স্বীয় অধিকারে নয়, শুধু সেবিকার কাজ সাধন করে তার বিনিময়ে তা লাভ করত। বিবাহ অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দকে আবদুল মুত্তালিব মিষ্টি খেজুর এবং সেরা পানীয়ের দ্বারা আপ্যায়িত করেছিলেন। বিশেষত ধনী ও সম্ভ্রান্ত পরিবারে এ নিয়মটি প্রায় বাধ্যতামূলক ছিল। তা ছাড়া গরিব ও সাধারণ পরিবারেও তা সাধ্যানুসারে প্রতিপালন করা হত।



উত্তমতায় পরিপূর্ণ

আমেনা ও আবদুল্লাহ দম্পতি যুগলের মধ্যে উভয়ে ছিলেন গুণবান, গুণবতী, রূপবান-রূপবতী, বুদ্ধিমান-বুদ্ধিমতী । মােটকথা, দু'জনেই ছিলেন সর্বদিক দিয়ে উত্তম চরিত্র ও গুণের অধিকারী। সুতরাং একে অপরের গুণে মুগ্ধ এবং আকৃষ্ট ছিলেন পুরাপুরিভাবে। একজন আরেক জনকে বন্ধন করেছিলেন প্রীতি ও ভালবাসার রঞ্জু দ্বারা। মােটকথা, তাদের উভয়ে মধুময় দাম্পত্য জীবন-যাপন করছিলেন।


 পরস্পর গভীর প্রেম-ভালবাসার মধ্য দিয়েই তারা সাধন করে যাচ্ছিলেন পারিবারিক কর্তব্যসমূহ। যুগের প্রভাব এবং প্রচলিত রীতি অনুসারে তখন আরবে গৃহবধূরা নানা সময়েই স্বামীর হাতে নিগৃহীত হত এবং পদে পদে তাকে শ্বশুর-শাশুড়ী ও দেবর-ভাসুর দ্বারা লাঞ্ছিত ও অপমানিত হতে হত। কিভু কুরায়েশ গােত্রের বনু হাশেমী শাখায়ই এর বিপরীত অবস্থা ছিল। এদের কোন পরিবারে স্বামী তার স্ত্রীকে ঘৃণা বা অত্যাচার করত না এবং আত্মীয়গণও গৃহবধূরসাথে কোনরূপ দুর্ব্যবহারের প্রয়াস পেত না। 


গােত্রীয় সভ্যতার এই ধারা অনুসারেও সাইয়্যেদ আবদুল্লাহ স্ত্রী আমেনার সাথে অতি মধুর আচরণ প্রদর্শন। করতেন, বিনিময়ে তিনিও তার পক্ষ হতে আন্তরিক প্রেম ও উত্তম আচরণ লাভ। করতেন। এ দম্পতিযুগল দীর্ঘ পারিবারিক কিংবা দাম্পত্য জীবন যাপনে সক্ষম। হন নি। তবে যতদিন তারা একসাথে জীবন যাপন করেছিলেন, কোন দিনই তাদের মধ্যে সামান্য ঝগড়া বা কলহ দেখা যায় নি। সত্যি বলতে কি সে যুগের উৎখল জীবনযাপনে সুখী ও এরূপ শান্ত পারিবারিক জীবন যাপন অনভ্যস্ত ও অসুখী লােকেরাও আবদুল্লাহ ও আমেনার পারিবারিক সুখ অবলােকন করে হিংসায় জ্বলে উঠত আর বলত যে, সত্যই ওদের পরিবারটি সুখী পরিবারই বটে।


 বিবি আমেনা তাঁর অনুপম ব্যবহার দ্বারা শুধু স্বামীকেই যে খুশী করতেন তা নয়, বৃদ্ধ শ্বশুর-শাশুড়ীকে তিনি স্বীয় পিতা-মাতার অনুরূপ ভক্তি-শ্রদ্ধা করতেন। তারাও এ পুত্র বধূটিকে নিজেদের কন্যার মত স্নেহ ও আদর করতেন। শুনা যায়, আবদুল মুত্তালিব তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র আবদুল্লাহর স্ত্রী এ আমেনা বিবিকে এত ভাল জানতেন ও স্নেহ করতেন যে, তার নজীর এ বর্তমান যুগেও পাওয়া দুষ্কর। আরবে সে যুগে বিধবা বিবাহ প্রচলিত ছিল।


 বিবাহিতা যুবতী নারীর স্বামী অকালে মরে গেলে কিছুদিনের মধ্যেই সে নারী অন্য স্বামী গ্রহণ করত। কিন্তু বিবি আমেনার ক্ষেত্রে তার বিপরীত দেখা যায়। তিনি স্বামী আবদুল্লাহকে এমনই অধিক ভালবাসতেন ও তাঁর প্রতি এত অধিক অনুরক্ত ছিলেন যে, স্বামী আবদুল্লাহর পরলােক গমনকালে তিনি পরিপূর্ণ যুবতী ও অনুপম রূপলাবণ্য এবং দেহ সৌষ্ঠবের অধিকারিণী হওয়া সত্ত্বেও স্বামীর অবর্তমানে তিনি অন্য স্বামী গ্রহণ করার কল্পনা পর্যন্ত করেন নি। 


বিবি আমেনার আত্মীয়- স্বজন ও হিতাকাংখীগণ অনেকেই তাঁকে দ্বিতীয় বিবাহ করতে পরামর্শ দিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে এ সব পরামর্শ প্রত্যাখ্যান করেবৈধব্যকেই নিজের জন্য উত্তম বলে মেনে নিয়েছিলেন। অবশ্য সকলেরই জানা কথা যে, বিবি আমেনার এ বৈধব্য জীবন কম দীর্ঘ ছিল না, কিন্তু নারীর সমস্ত রূপ-রস রুচি ও বৃত্তিসমূহ নিজের মধ্যে রেখেই তিনি যেখানে যে কয়টি বছর সম্পূর্ণ নিষ্কলঙ্ক এবং পবিত্র জীবন যাপন করেছিলেন বিশেষত আরবের সে দুর্ধর্ষ পাশবিক আমলে তা জগতের ইতিহাসে চিরকালের জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।




গর্ভধারণের লক্ষণসমূহ

সাইয়্যেদ আবদুল্লাহ ও বিবি আমেনার দাম্পত্য জীবন ও সুখী সংসারের পরিচয় আমরা ইতােপূর্বে জ্ঞাত হয়েছি। পরম শান্তি ও সুখের মধ্যে এ নব । দম্পতি যুগলের দিনাতিবাহিত হচ্ছিল । কিছু দিনের মধ্যে সৃষ্টির স্বাভাবিক রীতি।  অনুসারে আমেনা অন্তঃসত্তা হলেন। আবদুল মুত্তালিব যখন জানতে পারলেন যে,| তাঁর কনিষ্ঠ পুত্রবধূ অন্তঃসত্তা হয়েছে, তখন আর তার আনন্দের সীমা রইল না। নূরে মােহাম্মদী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবদুল্লাহর ললাট হতে আসল ও বাস্তবরূপে এবার বিবি আমেনার উদরে স্থান লাভ করলেন। 


এ ঘটনার পর একটি। বিষয় সকলেরই চোখে ধরা পড়ে যেতে লাগল তা হচ্ছে যে, দেখা গেল বিসি আমেনার গর্ভধারণ করা হতেই আবদুল্লাহর চেহারার পূর্বের সে দীপ্তি তিরােহিত হয়ে গেল। পক্ষান্তরে, এ সময়ে বিবি আমেনার দৈহিক সৌন্দর্যরাশি শতগুণে বৃদ্ধি পেল এবং দিন দিন যেন আরও বেড়ে যেতে লাগল । বলা বাহুল্য যে, নূরে মােহাম্মদীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রভাব শুধু তার আশ্রয় স্থলের বাহ্যিক রূপ বর্ধনেই সীমিত নয়। তার শক্তি ও প্রভাব সারা বিশ্ব জুড়ে, তার ক্ষমতা ব্যাপক, সুদূর প্রসারী ও অপূর্ব-অদ্ভুত। সারা জগতের অন্ধকার রাশি তার দ্বারাই দূরীভূত হয়েছিল। 


জগৎ জুড়িয়ে ধর্মারােক, ন্যায়-নীতিজ্ঞান ও শান্তির বন্যা ঐ অপূর্ব নূরের দ্বারাই প্রবাহিত হয়েছিল। বস্তুত এ নূরে মােহাম্মদীই ছিল অশান্ত জগতকে শান্তির পথ প্রদর্শক এবং নিরাশায় ঘেরা সৃষ্টিকুলের মনে উজ্জ্বল আশার আলােক। সুতরাং এর প্রভাব অসীম, অসামান্য ও অবর্ণনীয়। এ নূর যখন তার বাস্তব রূপ নিয়ে ধরিত্রীবক্ষে আত্মপ্রকাশের উদ্যোগ নিল ও তন্নিমিত্ত বিবি আমেনার গর্ভে আশ্রয় গ্রহণ করল, তখন হতে নানা ধরনের নিদর্শনাদি বা সুলক্ষণসমূহ বিবি আমেনার চোখে ভেসে উঠতে লাগল। অনেক লক্ষণ তিনি অনুভব করলেন এবং বহু নিদর্শন তিনি উলব্ধি করলেন। তা এত বেশি সংখ্যক যে সবগুলাে বর্ণনা করা সম্ভব নয় । শুধু কয়েকটি বিশেষ সুলক্ষণের ঘটনা এখানে উল্লেখ করতেছি। 


এ সমস্ত সুলক্ষণ, সুসংবাদ বা ইঙ্গিতের কোন কোনগুলাে তিনি লাভ করেছিলেন স্বপ্নের মাধ্যমে এবং কোন কোনগুলাে সম্পূর্ণ জাগ্রতাবস্থায় । বিবি আমেনা গর্ভে ধারণ করে প্রায়ই আশ্চর্য ধরনের স্বপ্ন দেখতেন এবং স্বপ্নের মাধ্যমে তাকে সুসংবাদ দান ও বিভিন্ন বিষয়ে সাবধান ও সতর্ক করা হত। যে আরব মরুতে বৃষ্টি বাদল নেই, বৃক্ষলতা তৃণ-ঘাসের একান্ত অভাব। চারদিকে শুধু বালুকারাশির খেলা, মরুদ্যানগুলােতে যে সামান্য তৃণ ও গুল্ম বিদ্যমান, তার অবস্থা বড়ই করুণ, যেন রৌদ্র ও আগুনের উত্তাপের বিরুদ্ধে লড়াই করে ঢলিয়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে ।


এরূপ আরবে হঠাৎ কি এমন কারণটি ঘটল, যার ফলে তথাকার প্রকৃতিগত রূপ বহাল থাকতেই বিভিন্ন অবস্থার পরিবর্তন দেখা গেল। মরুভূমিই রইল অথচ তার বাগানগুলােতে তৃণ-গুচ্ছগুলাে তরতাজা দেখা গেল। তার মাঝে ফুল ফুটিয়ে উঠল । গােচারণ ভূমিগুলাে ঘাসে পূর্ণ হল । শীর্ণ পশুগুলো হৃষ্ট-পুষ্ট হল । মেষগুলাে বেশি দুধ দিতে শুরু করল। বায়ুর স্পর্শ স্নিগ্ধতাসহ বইতে লাগল । চারদিকে এক নতুন আনন্দ ও উত্তেজনার রেশ দেখা গেল। বিবিআমেনার চোখে এ সব দৃশ্য ভেসে উঠলে, তিনি অনেকটা অনুভব করতেন যে, নিশ্চয় এ লক্ষণসমূহের কারণ অনেকটা কল্যাণে তা সম্ভব হল, কোন শ্রেষ্ঠ সৃষ্টির।


 গ্রাবির্ভাবের পূর্ব লক্ষণরূপে এগুলাে ঘটছে। একরাতে বিবি আমেনা স্বপ্নে। দেখলেন যে, কে যেন তার প্রতি সাবধান বাণী উচ্চারণ করে বলতেছে, হে। সোমেন! তুমি হুশিয়ার থেক। তােমার গর্তে যে মহামানব সন্তান আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি সারা জাহানের শ্রেষ্ঠ মানব। সে আবার তাকে বলল যে, হে আমেনা ! নবীকুল শিরােমণি সাইয়্যিদুল আম্বিয়া তােমার উদরে স্থান লাভ করতেছেন, তার অবমাননা ঘটতে পারে, এ ধরনের কোন কাজ তুমি কস্মিনকালে। হন। এমন সময় তার উরুদেশ হতে একটি নূরের ঝলক উত্থিত হয়ে। না। আর এক রাতে তিনি স্বপ্নে দেখলেন, একটি বৃক্ষছায়ায় তিনি অবস্থান বুদিকে পরিব্যাপ্ত হয়ে পড়ল এবং তার আলােকে সমগ্র বিশ্ব জগত উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। 


আর এক রাতে তিনি খাবে দেখলেন, আকাশে একটি অত্যুজ্জ্বল। আলােক রশ্মি ছড়িয়ে রয়েছে। এর আলােক ছটায় চন্দ্র, সূর্য ও গ্রহ-নক্ষত্রের অজুল্য অধিকতর বৃদ্ধি পেয়েছে, ক্রমে সে আলােক রশ্মি পূর্ণশশীর রূপ ধারণ করে তার কোলে নেমে আসল এবং তিনি তাকে চুম্বন করলেন । গর্ভাবস্থায় বিবি আমেনা যখন একাকিনী গৃহে শায়িত থাকতেন তখন জাগ্রতাবস্থায়ই কখনও কখনও তিনি হঠাৎ এরূপ আওয়াজ শুনতেন, হে জগতের শ্রেষ্ঠ জননী ! হে মহানবীর জননী! সালাম গ্রহণ করুন। 


হঠাৎ একবার মাত্র এরূপ আওয়াজ শুনে যখন আমেনা ঐ আওয়াজের দিকে পূর্ণ মনােযােগের সাথে কর্ণনিয়ােগ করতেন তখন আর তিনি ঐরূপ আওয়াজ শ্রবণ করতেন না। বিবি আমেনার গর্ভসঞ্চার হওয়ার পর আল্লাহ্ তাঁর পবিত্র অঙ্গে এমন এক খােশবু প্রদান করেছিলেন যে, তিনি যখন কোথাও বসতেন, হাঁটতেন, শায়িত থাকতেন সব সময়ই তার অঙ্গ হতে এক অনুপম সুঘ্রাণ বিচ্ছুরিত হতে থাকত। এমনকি আমেনা নিজেও নিজের অঙ্গ হতে এরূপ সুঘ্রাণ লাভ করতেন।


 বিবি আমেনা নিজেই বলেছেন, আমার পুত্র হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ভূমিষ্ঠ হওয়ার পূর্বে একদা রাতে আমি স্বপ্নে দখতে পেলাম, জনৈক সৌম্যদর্শন বােযর্গ পুরুষ আমাকে সম্বােধন করে বললেন, হে আমেনা খাতুন! তােমাকে শুভ সংবাদ প্রদান করা হচ্ছে যে, তােমার গর্তে যে গুন অবস্থান করছেন, তিনি হবেন রাসূলদিগের সরদার, আম্বিয়াদের শেষজন এবং সারা দুনিয়ার রহমত স্বরূপ। ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর তুমি তার নাম রাখবে মুহাম্মদ ।


 তৌরাতে এবং ইনজিল কিতাবে তাকেই আহমদ নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে। বিবি আমেনা বলেন, আমার পুত্র মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া "সাল্লাম ভূমিষ্ঠ হওয়ার পূর্বরাত্রে আমি স্বপ্নে দেখলাম, আসমান হতে একটি উজ্জ্বল।তারকা নেমে এসে আমার গৃহের ভিতরে প্রবেশ করল। অতঃপর তা সেখান নতার আলোকে আমি দেখতে পেলাম বাদশাহ নওশেওসাৰ। সকালেন এবং চৌম বুক চুর্ণ হয়ে গেল। হাজার বছর পূর্বের পারস্যের।


 অগ্নিপূজকগণ যে অগ্নিকুও প্রজ্জ্বলিত করে রাখছিল তা নিভিয়ে গেল । পবি) হে ফিজ ৩৮০টি দেণমৃতি উপুড় হয়ে পড়ে গেল। বিৰি আমেনা বলেন। যে, আমি এরূপ স্বপ্ন দেখে বুঝতে পারলাম যে, আমার পুত্রের জন্মের ফলে ভবিষ্যতে সারা দুনিয়ার একটা বিরাট পরিবর্তন সাধিত হবে । অন্য এক রাত্রিতে তিনি আর একটি স্বপ্ন দেখলেন, ফারান পর্বত একটি উজ্জ্বল আলােক শিখা বের হয়ে তা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল আর তার তী আলোকে সুদূর সিরিয়া ও রােম সাম্রাজ্যের প্রাসাদসমূহ তার চোখের সম্মুখে ভাসিয়ে উঠল।


 বিবি আমেনা তার গর্ভকালীন সময়ে প্রায় প্রতি রাতেই এরূপ একটা না একটা অদ্ভুত ও আশ্চর্য স্বপ্ন দর্শন করে নিতান্ত ব্যাকুল এবং উদ্বিগ্ন হয়ে পড়তেন। তিনি তার প্রতিবেশিনী স্ত্রীলােকদের নিকট এসব স্বপ্নের বিবরণ খুলে বলতেন। শুনে তারা তাকে ভয়ভীতি দেখাতে লাগল এবং নিজেদের অজ্ঞতা সুলভ সংস্কার বলে এসব ঘটনাকে জ্বিন-ভূতের উপদ্রব বলে তাকে তাবিজ গ্রহণ করতে উপদেশ দিল । একদিন জনৈকা প্রৌঢ়া মহিলা বিবি আমেনার মুখে তার স্বপ্ন বিবরণ শুনে বললেন, মা গাে! তােমার উপরে জ্বিনের আছর হয়েছে। তুমি যদি লৌহ নির্মিত বালা এবং গলায় লৌহের হাঁসুলী ব্যবহার কর তা হলে আর জ্বিন বা ভূত-প্রেতে কখনও তােমার ক্ষতি সাধন করতে পারবে না। 


এ সমস্ত ধারণাগুলাে ছিল তখনকার আরবের লােকদের সংস্কার । কোন অস্বাভাবিক বা অসাধারণ কোন কিছু দেখলেই তারা ঐ সমস্তকে জ্বিন-পরীদের কাণ্ড বলে মনে করত এবং তাবীজ-তদবীর ও মন্ত্র-তন্ত্র দ্বারা তা সংশােধন করার প্রয়াস পেত। শুধু মেয়েলােকেরাই নয় আরবের পুরুষ এমনকি শিক্ষিত পুরুষেরা পর্যন্ত এ ধরনের কু-সংস্কারসমূহে আবদ্ধ ছিল। বিবি আমেনা সে যুগের রমণী হিসেবে প্রচলিত রীতি অনুযায়ী তিনিও কম-বেশি ঐসব কুসংস্কারে বিশ্বাসিনী ছিলেন। সুতরাং উল্লিখিত পৌঢ়া মহিলার পরামর্শ মত হাতের বাজুতে লােহার বালা ও গলায় লােহর হাসুলী পরিধান করলেন । 


ঐদিন রাতে বিবি আমেনা স্বপ্নে দেখলেন, শ্বেত বস্ত্র পরিহিত এক বয়স্ক বাের্গ ব্যাক্তি তাকে সম্বােধন করে বললেন, হে আমেনা! তােমাকে বার বার সতর্ক করা সত্ত্বেও তুমি সে প্রাচীন কুসংস্কারসমূহ মেনে চলেই যেগুলাে সমূলে উৎপাটিত করার জন্যই তােমার সন্তান মহানবীরূপে দুনিয়ায় আসছেন। তুমি নিশ্চয় অবগত নও, তােমার উদরে যিনি অবস্থান করছেন। তিনি হবেন সারা দুনিয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব।তুমি কত বড় সৌভাগ্যশালিন মহিলা যে, অচিরেই তুমি সে মহামানবের ননী হতে চলেছ। বিশ্ব মানব অদূর ভবিষ্যতেই তোমাকে বিশ্ব নবীর ননী বলে। ধন করবে।


 তিনি জগতে এসে সব অনাচার-দাচাৰেৰ বিরুদ্ধে সংগ্রাম, হাদ ঘােষণা করবেন। অার তুমি কিনা তার জননী হয়ে সে সব জলচারে লিপ্ত রয়েছে। তােমাকে সাবধান করছি, আজই তুমি তোমার অঙ্গের ঐ বালা ও হাসল। খুলে ফেলবে এবং কস্মিনকালেও এসব কুসংস্কারসমূহে বিশ্বাস করবে না। এ কথা । বলে বুযুর্গ ব্যক্তি বিবি আমেনার হাতের লােহার বালা ও গলার হাঁসুলীর প্রতি। তীকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন। সঙ্গে সঙ্গে তা ভেঙে খান খান হয়ে অঙ্গ হতে খুলে অতঃপর ঐ বুযুর্গ ব্যক্তি অদৃশ্য হয়ে গেলেন এবং বিবি আমেনার ন্দ্রিা ভেঙে গল। তিনি জেগে দেখলেন যে, সত্যই তার বালা ও হাঁসুলী অঙ্গ হতে খুলে বিছানার উপরে পড়ে রয়েছে। সাথে সাথে তিনি প্রতিজ্ঞা করলেন, জীবনে কখনও আর ঐসব কুসংস্কারে বিশ্বাস করবেন না ।



আব্দুল্লাহর পরলােক গমন

বিবাহের বার মাস পরে আব্দুল্লাহ ব্যবসায় উপলক্ষে সিরিয়া গমন করলেন । ঐ সময় বিবি আমেনা ছিলেন ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা। সিরিয়া হতে প্রত্যাবর্তন কালে আব্দুল্লাহ মদিনায় কয়েক দিনের জন্য বিশ্রাম করেছিলেন। মদিনা তখন ইয়াসরেব’ নামে পরিচিত। এ ইয়াসবেরই ছিল আব্দুল্লাহর শ্বশুরালয় অর্থাৎ আমেনার পিতা ওয়াহাব যুহরীর বাসস্থান। আব্দুল্লাহর মাতুলালয়ও ছিল এই ইয়াসরেবেই অবস্থিত।


 আব্দুল্লাহ তাঁর মাতুলালয়েই গিয়ে উঠেছিলেন । ঘটনাবশত সেখানে তিনি ভীষণ জ্বরে আক্রান্ত হলেন। মামা ও শ্বশুর তার চিকিত্সায় কোন ক্রটি করলে না, কিন্তু জ্বর আরােগ্য হওয়ার পরিবর্তে দিন দিন বৃদ্ধি পেতে লাগল । রােগের অবস্থা কঠিন দেখে আব্দুল্লাহর রােগের অবস্থা উল্লেখ করে মক্কায় আব্দুল মুত্তালিবের নিকট সংবাদ পাঠানাে হল । এ সংবাদ প্রাপ্ত হয়ে আব্দুল মুত্তালিব ও বিবি আমেনা অত্যন্ত চিন্তাকুল হয়ে পড়লেন। আব্দুল মুত্তালিব তাঁর জ্যেষ্ঠপুত্র হারিসকে মদিনায় পাঠিয়ে দিলেন, মক্কায় নিয়ে যাওয়ার জন্য। আব্দুল্লাহ প্রায় মাসাধিককাল রােগ ভােগ করে এতই দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন যে, তদবস্থায় তাকে উষ্ট্রের পিঠে উঠাইয়ে মক্কায় নিয়ে আসা সম্ভব ছিল না।


 কাজেই সকলেই অপেক্ষা করতে লাগলেন যে, শরীরটা একটু সুস্থ এবং বল হলে তার মক্কা যাওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। কিন্তু হায়! কে জানত যে, আব্দুল্লাহ তাঁর পিতৃ ভূমি হতে এবার চির বিদায় নিয়ে এসে ছিলেন। যদিওমাতুলের গৃহে তার সেবা-যত্নের কোন ক্রটি হতে ছিল না, তথাপি তিনি আসার জন্য নিতান্ত ব্যাকুল হয়ে পড়ে ছিলেন। কারণ মক্কায় তার বৃদ্ধ পিতা ও স্ত্রী আমেনার জন্য তাঁর চিন্তার অন্ত ছিল না। মাতুল, মাতুলানী ও শ্বশুর-শাশুড়ী প্রমুখের আপ্রাণ সেবা-শুশ্রুষা ও যত্ন-চেষ্টা সকলই বিফল হল। কিছুতেই তাঁকে বেঁধে রাখতে পারল না। 


মামার গৃহেই তিনি সকলেই মায়া কাটায় ইহকাল হতে চির বিদায় গ্রহণ করলেন। বৃদ্ধ পিতা আব্দুল মুত্তালিব তার জ্যেষ্ঠ পুত্র হারিসকে মদিনায় পাঠাইয়া দিয়ে ছিলেন আব্দুল্লাহকে মক্কায় নিয়া আসার জন্য। কিন্তু আফসােস! হারিস আব্দুল্লাহকে নিয়ে আসার বদলে পিতার নিকট বহন করে আনলেন কনিষ্ঠ ভ্রাতার কঠিন মৃত্যুর সংবাদ। বৃদ্ধ পিতা আব্দুল মুত্তালিব ও স্ত্রী আমেনার হৃদয় এ দুঃখজনক সংবাদে একবারে ভেঙে গেল। আব্দুল্লাহর এ অকাল মৃত্যুতে মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাতৃগর্ভে অবস্থান কালেই পিতৃহীন অর্থাৎ জন্ম ইয়াতীম হয়ে পড়লেন।


সন্তান প্রসবের শুভ ইঙ্গিত

বিবি আমেনার প্রসবকাল ক্রমে ঘনিয়ে আসল । তিনি বুঝতে পারলেন তার। সেই কঠিন মুহূর্তটি প্রায় সমাগত। এ সময় এক গভীর নিশিতে তিনি একটি অপূর্ব স্বপ্ন দেখলেন। তারিখটি ছিল চন্দ্র মাসের ১২ তারিখের জ্যোৎস্না রাত্রি । সময়টি ছিল মধ্যাহ্নকালীন গভীর রজনী-সমগ্র আরব তথন সুপ্তির কোলে মগ্ন এমনি সময় মক্কার এক কুটিরবাসিনী আমেনা এক অপূর্ব স্বপ্ন দেখছিলেন। তিনি দেখলেন, উর্ধ্বাকাশে এক অত্যুজ্জ্বল শশী। 


যে শশীর উজ্জ্বল আলােকে আকাশের তারকাদের আলােকে আভা নিষ্প্রভ হয়ে গিয়েছে। সমগ্র ধরণী সে চাদটিকে পাওয়ার আশায় উদগ্রীব হয়ে আছে। তরুলতা, গাছপালা, পশু পাখি সবাই তাকে শ্রদ্ধাপূর্ণ সালাম নিবেদন করতেছে। পাহাড় পর্বত, নদ-নদী, সাগর-উপসাগর সবই তাঁকে সশ্রদ্ধ অভ্যর্থনা জ্ঞাপন করছে। সকলের মনে আশা এ চাদ তার গৃহেই আবির্ভূত হােক ও তার সমুজ্জ্বল আলাের্ক সারা জগতকে উদ্ভাসিত করে তুলুক। 


বিবি আমেনা স্বপ্নটি দেখছেন। আর মনে মনে এত অপূর্ব আনন্দ উপভােগ করছেন। এক অকল্পনীয় শান্তি সুধা তার সমগ্র দেহ-মনে শান্তির প্রলেপ বুলেই দিয়েছে। বিবি আমেনা আরও দেখলেন, তাঁর ক্ষুদ্র কুটিরখানি সমুজ্জ্বল আলােকে আলােকিত হয়ে গেছে। অল্পক্ষণের মধ্যেই ধরিত্রীর পানে ধীরে ধীরে অবতরণ করতে লাগল। সাথে সাথে বিশ্ব প্রকৃতিতে আনন্দের জোয়ার প্রবাহিত হল। বিবি আমেনা লক্ষ্য করলেন, বিশ্ব ধরার চরম আনন্দ কোলাহল মাঝে আকাশের সে পূর্ণ চন্দ্র তার পর্ণ কুটিরাভিমুখে নেমে আসছে। সাথে সাথে আনন্দ কোলাহল মাঝে সারা বিশ্ব জুড়ে আওয়াজ উঠল,ধন্য আমেনা ধন্য এ জগতে শুধু তুমি ধন্য। তুমি সার্থক নারী, তুমিই সার্থক জননী। আমরা সকলে শ্রদ্ধার সাথে তােমাকে সালাম করি ।


সেরা মানব ধরার কোলে


রবিউল আউয়াল মাসের ১২ই তারিখ সােমবার রাতে পূর্বোক্ত স্বপ্নটি দেখে বিবি আমেনা বুঝতে পারলেন তিনি আসন্ন প্রসবা। দ্বাদশীর চাঁদ তখন অস্তমিত হয়েছে। রাত আর বেশি বাকি নেই । কিন্তু নিশ্চিদ্র অন্ধকারে তখন সকল কিছু আচ্ছন। এ পরিবেশের মধ্যে তিনি অনাগত শিশুকে বরণ করে নেয়ার জন্য মনে মনে নিজেকে প্রস্তুত করে নিয়েছিলেন । নারীর এমন জীবন-মরণ স্কট কালে নেয়ার জন্য মনে মনে পরিচর্যাকারিণী না থাকায় বিবি আমেনা একটু চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন।


 কিন্তু তা মুহূর্তকালের জন্য। তিনি দেখলেন, হঠাৎ তার গৃহখানি উজ্জ্বল আলােক ছটায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে। কেউ তাঁকে পাখা করছেন, কেউ তাঁর জন্য পানি আনছেন। কেউ তাকে শরবত পান করাচ্ছেন। তিনি আরও দেখলেন, কতিপয় অপূর্ব বেশধারিণী মহিলা তার গৃহ মধ্যে প্রবেশ করলেন। তারা নিজেদের পরিচয় দিতে গিয়ে একজন বলেন, আমি ফেরাউনের স্ত্রী বিবি আছিয়া। আর একজন বললেন, আমি হযরত ঈসা (আ)-এর মাতা বিবি মরিয়ম । এসব পুণ্যবতী আপনার পরিচর্যার জন্য আগমন করছি। ক্রমে রাতের আঁধার দূরীভূত হয়ে সবেমাত্র ভােরের আলাে প্রকাশ পেতে শুরু করেছে। প্রভাতের উষ্ণ পরশে সৃষ্টিকুল ঘুমের রাজ্য হতে। কেবল জেগে উঠছে।


 মৃদুমন্দ সমীরণ শান্তির পরশ বুলিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পাখিকুল কূজন তুলে কাজ যেন অভ্যর্থনা জানাচ্ছে। প্রকৃতি জগৎ যেন কিসের আনন্দে মুখর। বিবি আমেনা অনুভব করলেন, কি এক নৈসর্গিক পরির্তনে সমগ্র প্রকৃতি অপরূপ সাজে সজ্জিত হচ্ছে। চারদিকে শুধু আনন্দের ঢেউ। এসব দেখে-শুনার মুহূর্ত মধ্যে যেন তার প্রসব বেদনা প্রশমিত হল । মনে হল যেন তিনি কোন এক আনন্দ করছেন। সেখানে শােক, দুঃখ-বেদনার লেশ নেই, আছে শুধু আনন্দ আর আনন্দ । 


বিবি আমেনা চোখ মেলে চেয়ে দেখলেন,একটি সুন্দর ফুটফুটে শিশু জন্মলাভ করেছেন। অতি অনুপম লাবণ্যময় তার চেহারা। তাঁর দিকে চেয়ে থাকতে ইচ্ছা হয় । চোখ ফিরে নিতে ইচ্ছা হয় না। মনে হয় এ যেন কোন মানব শিশু নয়, যেন এক স্বর্গীয় নূরের ঝলক। বিবি আমেনার নেত্রদ্বয় জুড়িয়ে গেল। তিনি শিশুটি ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করতে উদ্ধত হলেন, কিন্তু তার প্রয়ােজন হল না।


 স্বর্গীয় মহিলাগণ তাঁকে ইতােমধ্যে পরিষ্কার করে রেখেছিলেন। বিবি আমেনা তাকে কোলে উঠালেন এবং মমতার আতিশয্যে তাঁর কোমল গণ্ডে। মেহের পরশ একে দিলেন। আরবের অভিজাত পরিবারে সে যুগে শিশুর জননী। শিশুকে পান করত না। ধাত্রীগণ তাদেরকে বুকের স্তন্য দিয়ে লালন-পালন। করত। বিবি আমেনা একটি শিশু পুত্র প্রসব করেছেন শুনে স্বগােত্রীয় মহিলা দাসী সােয়ায়বিয়াও তাদের মধ্যে ছিল। শিশুকে দেখা মাত্রই তার অন্তরে সদ্যজাত শিশুটিকে দেখার জন্য ছুটে আসছেন। শিশুর সৎ চাচা আবু লাহাবের। অনাবিল মায়ার উদ্রেক হল। সে তখন শিশুকে কোলে তুলে নিয়ে তাকে নিজ। স্তন্য পান করতে লাগল। এ সােরায়বিয়াই ছিল শিশু বিশ্ব নবীকে সর্বপ্রথম। দানকাররিণী। শিশুর জন্য ধাত্রী নিযুক্ত না হওয়া পর্যন্ত সােয়ায়বিয়াই তাঁকে বুকের দুগ্ধ পান করিয়েছিল ।



চিরবিদায়

জগতের শ্রেষ্ঠ মানব মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইয়াতীমরূপে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, অর্থাৎ তাঁর জন্মের পূর্বে পিতা আবদুল্লাহ ইহধাম ত্যাগ করেছিলেন। সুতরাং পিতা দর্শন এবং পিতৃস্নেহ লাভ করার সুযােগ তার ভাগ্যে জুটল না। তদুপরি ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর একাধারে পাঁচ বছর ধাত্রী হালিমার কোলে লালিত-পালিত হওয়ার কারণে তিনি মাতৃ-স্নেহ হতেও দূরে থাকলেন।অবশ্য বিবি হালিমা তাঁকে নিজ পুত্রের মত স্নেহ করেছিলেন ও তাঁকে প্রকৃত মায়ের মত মায়া-মমতা দ্বারা সিক্ত করেছিলেন। শিশু মহানবী তাঁর সে।স্নেহ-আদর ও যত্নের কথা জীবনে কোন দিন ভুলেন নি, বরং তাকে মাতৃজ্ঞানেই ভক্তি-শ্রদ্ধা করেছিলেন। বিশেষত তিনি শিশুকালে তার এ দুগ্ধপােষ্য সন্তানকে মৃত্যু পর্যন্ত কোনদিন ভুলতে পারেন নি।


দীর্ঘ পাঁচ বছর পরে যদিও শিশু মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ধাত্রী মাতার নিকট হতে মাতা আমেনা নিকট ফিরে আসলেন, কিন্তু মাতা আমেনার স্নেহ ভােগ করার সুযােগ বেশি দিন ভাগ্যে জুটল না। অতি অল্প দিনের মধ্যে নিয়তির অমােঘ বিধান তাঁকে জননীর কোল হতে বিচ্ছিন্ন করে দিল । বিবি আমেনার কোলে শিশু মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফিরে আসার কিছুদিন পরে আমেনার মনে চাইল মােহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মদিনা নিয়ে গিয়ে তার পিতৃকুলের লােকজনকে দেখায়ে আনবে এবং সে সঙ্গে তিনি তার স্বামী আবদুল্লাহর কবর জিয়ারত করতে আসবেন ।


 যথাসময়ে বিবি আমেনা তার মনের বাসনা পূর্ণ করতে উম্মে আয়মন নাম্নী এক পরিচারিকাসহ কিশাের পুত্র মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সঙ্গে নিয়ে মক্কা হতে মদিনা অভিমুখে রওয়ানা হলেন। মক্কা হতে মদিনা প্রায় চার শত কিলােমিটার।পুত্রসহ জনৈকা মহিলার পক্ষে কত যে কঠিন কাজ তা সহজে অনুমান করা যায়।দূরে অবস্থিত। এ সুদীঘি পথ অতিক্রম করে মদিনা গমন করা একটি কিশাের।কিন্তু স্বামীর কবর জিয়ারত করার উগ্র বাসনা তাকে এমনই ব্যাকুল করেছেন যে,তিনি এ প্রায় অসম্ভব কার্যের ক্লেশ ও বিপদের কথা একবারে ভুলে গেলেন।

বিরামহীন চলার মধ্যেই তিনি মদিনায় পৌছলেন। প্রথমে তিনি মুহাম্মদ।সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নিয়ে গেলেন স্বামীর কবর জিয়ারত করতে। কবরের নিকট উপস্থিত হওয়া মাত্র তার অন্তরে পটে পুরাতন স্মৃতিগুলাে একে জেগে উঠে তাকে ব্যাকুল করে তুলল।

তাঁর দু চক্ষু হতে অশ্রুর ধারা প্রবাহিত হয়ে দু গণ্ড এবং বক্ষস্থল প্লাবিত করেদিল। জননীর করুণ অবস্থা স্বচক্ষে দেখে বালক মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আজ বড় মর্মন্তুদভাবে অনুভব করলেন যে, তিনি পিতৃহীন অনাথ ।জন্মলাভ করে কোনদিন তিনি পিতৃ-মুখ দেখেন নি। পিতৃ-স্নেহ অনুভব করেননি। তবে সে জন্য হৃদয়ে কোনরূপ ব্যথাও ছিল না। কিন্তু আজই তিনি প্রথম সে পিতৃস্নেহ না পাওয়ার ব্যথা ও অভাব অনুভব করলেন। তাই জননীর দেখা দেখি তিনিও চোখের অশ্রু ধারণ করে রাখতে পারলেন না। তিনিও অনেক্ষণ ধরে পিতার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদলেন।


 বিবি আমেনা এক মাস মদিনায় কাটালেন। অতঃপর তিনি পুত্র ও উম্মে আয়মনকে নিয়ে মক্কা রওয়না করতে প্রস্তুত হলেন। ইতােমধ্যে আর একবার তিনি পুত্রকে নিয়ে স্বামীর কবর পাশে শেষ জিয়ারত করার জন্য গেলেন। হৃদয়ের সমস্ত বেদনা উজাড় করে দিয়ে আজ তিনি স্বামীর নিকট হতে বিদায় গ্রহণ করলেন। হায় ! তিনি কি সেদিন স্বপ্নেও ভেবেছিলেন, যে আর তিনি চিরজনমের তরেই স্বামীর নিকট হতে বিদায় নিয়ে যাচ্ছেন। এ জীবনে আর কোনদিন তিনি এ কবরের পাশে উপস্থিত হবেন না। বহু স্মৃতি, বহু ব্যথা নিয়ে বিবি আমেনা আঁচলে চক্ষু মুছে কবরস্থান হতে চলে আসলেন। অতঃপর পুত্র ও পরিচারিকা সঙ্গে নিয়ে মক্কা অভিমুখে রওয়ানা করলেন।


মক্কা ও মদিনার মধ্যবর্তী দীর্ঘ পথ অতিক্রম করা কঠিন কষ্ট, তদুপরি মাথার উপরে প্রখর রােদ্রের প্রচন্ড তাপ, নিচে উত্তপ্ত বালুকারাশির ভীষণ উষ্ণতা। এ সব মিলে বিবি আমেনার শরীরের ওপর প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছিল। পথে মক্কা ও মদিনার মধ্যবর্তী ‘আবওয়া নামক স্থানে পৌছে তিনি ভীষণ রােগাক্রান্ত। হয়ে পড়লেন। সুদূর প্রসারী ধুধু করা মরু-প্রান্তর-নিকটে কোথাও জনমানবের। ৫ মাত্র নেই শুধু উর্ধে দিগন্ত প্রসারী আকাশ আর প্রচন্ড সূর্যের তাপ আর নিম্নে। সমগ্র প্রান্তর জুড়ে উত্তপ্ত হয়ে পড়ল। এর মধ্যে তিনি পথিক। তারই একজন।রােগ শয্যায় এলিয়ে পড়লেন। হায় ! একটি কিশাের বালক ও একটি নারী পরিচালিকা ছাড়া সেবা-শুশ্রুষা করার কোন একটি লােক নেই। তাছাড়া তাদেরকে বা কে একটু সাহায্য করবে বা সান্ত্বনার বাণী শুনাবে ?


কে তাঁদের কানে দুটি প্রবােধ বাক্য শুনায়ে মনে একটু সাহস জাগাবে। উন্মে।আয়মন যথাসাধ্য চেষ্টা করে বিবি আমেনার সেবা-শুশ্রুষা করল কিন্তু তাতে কি লাভ হবে ? আল্লাহর মর্জি ছিল ভিন্নরূপ। বিবি আমেনা এবার বুঝতে পারলেন যে, তার সময় আসন্ন। তবে তাঁর নিজের জন্য মনে কোন দুঃখ ছিল না। দুঃখ হল তাঁর নয়নের মণি হৃদয়ের বিধি বালক পুত্র মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য। তার জন্য অন্তর ফেটে চৌচির হয়ে যেতে লাগল। ভূমিষ্ঠ হয়ে।পিতার মুখ দর্শন করেন নি । আজ হতে জননীর আঁচল খানিও মাথার ওপর হতে সরে মুছে দিবে চোখের অশ্রু ? বিবি আমেনা খুবই কষ্টের সাথে একবার পুত্র মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দিকে চোখ খুলে তাকালেন। সে দৃষ্টি বড়ই গভীর, কিন্তু মুখে কোন ভাষা জাগল না। তার পর তিনি একবার উম্মে আয়মনের দিকেও তাকালেন।


হস্ত-পদসমূহ শিথিল হয়ে আসছে। হঠাৎ তার চক্ষুদ্বয় ঊর্ধ্বগামী হল।পরক্ষণে আবার নিচে নেমে আসছিল। সঙ্গে সঙ্গে তার শেষ নিঃশ্বাস বের হয়ে আসল। (ইন্না লিল্লাহি অ-ইন্না ইলাইহি রাজিউন) বিবি আমেনার মৃত্যুতে নির্জন মরু-প্রান্তর বুকে একটি করুণ ও হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হল ।আয়মনের দু নেত্র অশ্রুর ধারা, বালক মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চোখে-মুখে মাতৃশােক ও বিষাদের কাল-কৃষ্ণ ছায়া দীর্ণ হৃদয়ের মর্মন্তুদল হাহুতাশ মরু-প্রান্তরে ও তথাকার আকাশ-বাতাসকে শােকাভিভূত করে ফেলল।কিন্তু এ বিজন মরুভূমির মধ্যে এ দুটি শােকাহত মানুষকে একটু সান্ত্বনা দেবারমত একটি লােকও নেই। এমন দুর্যোগপূর্ণ ঘটনা ও ভীষণ বিপদ কে কোথায় দেখেছেন ?


দাসী আয়মনের হৃদয় শশাকে, দুঃখে, কান্নায় ভেঙে পড়তে চায় কিন্তু কাঁদলে তাে চলবে না। তার মাথার উপরে তখন দুটি বিরাট কর্তব্য চাপল। একটি বিবি আমেনার শেষকৃত্য সম্পাদন করা।দ্বিতীয়টি বালক মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মক্কা নিয়ে গিয়ে দাদা আবদুল মুত্তালিবের নিকট পৌছে দেয়া। উম্মে আয়মন সব শােক-দুঃখ বক্ষে চেপে রেখে কর্তব্যের তাগীদে যেন শক্ত হয়ে গেল।


সে দু হাত দিয়ে বালু সরিয়ে কবর তৈরির কাজে আত্মনিয়ােগ করল। বালক মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও তার সাথে কাজে শরীক  হলেন অল্পক্ষণের মধ্যে কবর তৈরি হয়ে গেলে উম্মে আয়মন একা বহু কষ্টে বিবি আমেনাকে কবরে শােয়াই কোন প্রকারে তার দাফন কার্য সমাধা করল। এভাবে বিবি আমেনা মুক্ত আকাশের নিচে সুবিস্তীর্ণ প্রান্তরে বুকে লােকচক্ষুর অন্তরালে এক অজানা বালুকা ভূমিতে আত্মগােপন করলেন।

যেখান হতে কেউ কোন দিন আর তাকে খুঁজে বের করতে পরবে না। বালক মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর মাতার সাথে পিতার কবর জিয়রত করতে মদিনা গমন করছিলেন। আজ তিনি তাঁর মাতাকেও কবরে রাখে উম্মে আয়মনের সাথে একাকী মক্কা চলেন। মক্কা বৃদ্ধ আবদুল মুত্তালিব যখন এ দুঃসংবাদ শুনলেন যে, তাঁর সর্বাধিক স্নেহের পুত্রবধূটি এভাবে বিজন-বিগাঁয়ে রােগাক্রান্ত হয়ে বিনা চিকিৎসায় একরূপ অসহায় অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছেন।তখন তিনি শােকের আঘাতে আকুল হয়ে প্রিয় পৌত্রটিকে বক্ষে চেপে ধরে বাষ্পরুদ্ধ আওয়াজে বললেন, মা-গাে! তােমার দু’জনে বিদায় নিয়ে গেলে ?

আমার এ যাদুমণিটির দায়িত্বভার তােমার কেউ মাথা না নিয়ে এ বৃদ্ধের হাতে সমর্পণ করে গেলে, সে তা কিভাবে পালন করবে ? সেও যে মৃত্যুপথের যাত্রী হিসাবে গাঠুরী বেঁধেছে। বন্ধু আবদুল মুত্তালিব সত্য কথা বলেছেন।

অতি অল্পদিনের মধ্যে তিনিও মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ফেলে পরপারে পাড়ি জমালেন। অতঃপর পিতা-মাতা, দাদা অনাথ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্য সহায় বলতে আল্লাহ্ আছেন, আল্লাহ্  তাঁর  সর্বশ্রেষ্ঠ সহায়করূপে তাঁকে সর্ব সাফল্যের শীর্ষ স্থানে পৌছে দিলেন।

''Related searches''

ইসলামিক সাধারণ জ্ঞান প্রশ্ন ও উত্তর, 

সরাসরি ইসলামিক প্রশ্ন ও উত্তর, 

ইসলামিক জটিল প্রশ্ন

ইসলামিক কুইজ প্রতিযোগিতা ২০২০, 

ইসলামিক প্রশ্ন জিজ্ঞাসা, গুগল প্রশ্ন ও উত্তর

ইসলামিক সাধারণ জ্ঞান প্রশ্ন ও উত্তর pdf

ইসলামিক প্রশ্ন উত্তর ওয়েবসাইট

ইসলামিক গল্প

নবীদের জীবনী


১ম পর্ব  দেখতে এখানে click করুন







জান্নাতী রমণী [ পর্ব -০১ ] Jannati Romoni Chapter -1

আসসালামু আলাইকুম  প্রিয় দীনি ভাই ও বোন। জান্নাতী রমণী দের নিয়ে ধারাবাহিক পর্বে আজ আমরা জানব "হযরত আমেনা (রাঃ)" এর জীবনী। পর্ব -০১



হযরত আমেনা (রা)

জগতের শ্রেষ্ঠ জননী-

আল্লাহ রাব্বল আলামীন নারীর স্থান দিয়েছেন, সেটা সর্বজনস্বীকৃত । তবুও এ  ধরায় রত্ন-প্রসবা রমণী বা শ্রেষ্ঠ জননী অনেকেই আছেন, কিন্তু মা আমেনার।স্থান এ দিক দিয়ে নিঃসন্দেহে সবার ঊর্ধ্বে। কারণ বিভিন্ন দেশে ও বিভিন্নকালে রত্ন প্রসব করে অসখ্য রমণী ধন্য হলেও জগতের মহারত্ন বা সর্বশ্রেষ্ঠ রত্ন প্রসব করে নিজেকে সবার উর্ধ্বে প্রতিষ্ঠিত ও সেরা গৌরবে ভূষিত করেছেন শুধু একজন রমণীই এবং তিনিই মা আমেনা।


সাধ্বীকুল সেরা বিবি মরিয়ম হযরত ঈসা (আ)-এর মত শ্রেষ্ঠ নবীকে গর্তে ধারণ ও বিশ্ববাসীকে উপহার প্রদান করে নিজেকে পরম গৌরবান্বিতা মনে করেছিলেন সন্দেহ নেই, আখেরী নবীর আদুরে দুলালী, খাতুনে জান্নাত, নারী সম্রাজ্ঞী বিবি ফাতেমা (রা)-কে প্রসব করে বিবি খাদীজা (রা)-ও স্বীয় গৌরব ও মর্যাদাকে সর্বকালের শীর্ষস্থানীয় রূপে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। বিবি ফাতেমা (রা)-ও সারা মুসলিম জাহানের হৃদয়ের নিধি, আদরের ধন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কলিজার টুক্রা জগতের শ্রেষ্ঠ ইমাম ভ্রাতৃদ্বয় হাসান ও হােসাইন (রা)-কে মানব সমাজে উপহার দিয়ে নিজের অতুলনীয় মর্যাদাকে আরও অধিকতর রূপে বাড়িয়ে তুলেছিলেন।


এরূপ আরও বহু দৃষ্টান্ত উল্লেখ করা যায়, কিন্তু তা যতই করা হােক না কেন সারা জাহানের শ্রেষ্ঠ মানব, আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি ও সমস্ত মখলুকাত সৃষ্টির উছিলা এবং সৃষ্টিকুলের শান্তি ও রহমত, নবী এবং রাসূলগণের মাথার মুকুট হযরত রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে স্বীয় পবিত্র উদরে ধারণ ও বিশ্ব মানবকুলের সম্মুখে তুলে দিয়ে হযরত মা আমেনা যে অনন্য বা একক কৃতিত্ব সাধন করছিলেন তার তুলনা নেই । এ জন্যই বলেছি যে, এ ক্ষেত্রে বিবি হযরত আমেনার গৌরব সকল নারীর ঊর্ধ্বে।


তদুপরি একথাও সত্য যে, যেমন নারী জীবনের সাফল্য ও সার্থকতা এবং গৌরব ও মর্যাদা তার মাতৃত্বের মধ্য দিয়েই ফুটে উঠে এবং পরিপূর্ণতা লাভ করে তেমন আবার মাতৃত্বের মাধ্যমেই নারী জনসমাজের কাছে হেয়, ঘৃণিত এবং কুখ্যাত হয়ে থাকে। মােটকথা, উত্তম ও শ্রেষ্ঠ সন্তান প্রসব দ্বারা নারী নন্দিতা এবং গৌরবান্বিতা হন এবং অধম ও কুসন্তান গর্ভে ধারণ করে তাকে আবার নিন্দা ও কুষশের বােঝা বহন করতে হয়। মূলত নারী জীবনের সাফল্য এবং সার্থকতার প্রকৃত মাপকাঠিই তাঁর সন্তান।


যে নারী যতটা উত্তম ও শ্রেষ্ঠ সন্তান লাভ করে, সে ততটা সাফল্যের অধিকারিণী এবং যে যতটা অধম এবং কুসন্তান প্রসব করে, সে ততটা ব্যর্থ জীবনধারিণী। আরব দেশের কুরায়েশ ললনা বিবি।হযরত আমেনা উল্লিখিত দিক দিয়ে চরম সাফল্য লাভ করে অর্থাৎ হযরত রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মত পুত্র সন্তান লাভে ধন্য হয়েও জীবদ্দশায় জগতের তথা আরবের ইতিহাসে তেমন বহু আলােচিত ও অতি উল্লিখিত মহিলা হিসেবে নিজেকে গণ্য করে যেতে পারে নি । এর কারণ হল তার হওয়ার মাত্র কয়েক বছর পরেই তিনি পরলােক গমন করেন। 


তিনি যখন জগদ্বরেণ্য পুত্র রত্ন হযরত রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ভূমিষ্ঠ । তখন তিনি মৃত্যুবরণ করেন, তখন তাঁর পুত্ররত্ব শৈশবও অতিক্রম করেননি। সুতরাং যে সমস্ত কারণ ও ঘটনাসমূহ তাকে ঐতিহাসিকগণের চোখের সম্মুখে উজ্জ্বলভাবে ফুটিয়ে তুলবে সে সমস্ত কারণ ও ঘটনাসমূহ সংঘটিত হবার পূর্বেই তিনি ইহজগত হতে বিদায় নিয়েছিলেন।


জন্মগ্রহণ-

মা আমেনার পিতা ওয়াহাব বিন আবদে মানাফ অতিশয় শান্ত-শিষ্ট এবং বুদ্ধিমান লােক ছিলেন। দাদা যুহরার নামের সাথে মিলিয়ে তাকে তখন ওয়াহাবি যুহরী নামে ডাকা হত। তদ্বধি তিনি এ নামেই সমধিক পরিচিত হয়ে রয়েছেন। ওয়াহাব যুহরী তখন মদিনায় বাস করতেন। মদিনা তখন ইসরেব নামে পরিচিত ছিল। ওয়াহাব যুহরীর পূর্ব-পুরুষ মক্কায় বাস করত এবং এরা মক্কার বিখ্যাত কুরায়েশ বংশােদ্ভূত ছিল। 


এদের মধ্যে যে কে কখন কিভাবে মক্কা ছেড়ে মদিনায় বসবাস শুরু করে, তার সঠিক বর্ণনা পাওয়া যাচ্ছে না। তবে যতদূরসম্ভব মক্কার দখল নিয়ে খােযাআ কবিলা যখন কুরায়েশদের উপরে হামলা চালায় এবং তাদেরকে পরাস্ত করে মক্কা হতে তাড়িয়ে দেয়, সেই সময় হয় তাদের কোন পূর্ব পুরুষ মদিনায় গিয়ে বসবাস শুরু করেছিল এবং সে হতেই তাদের বংশধরগণ এখানে বসবাস করে আসছে। 


মদিনা বা ইয়াসরিবের আবহাওয়া মক্কার আবহাওয়ার তুলনায় অনেকটা স্নিগ্ধ ও মােলায়েম ছিল। তাই এখানকার মানুষের মন ও মেজাজ মক্কার লােকদের তুলনায় অনেকটা শান্ত-শিষ্ট ছিল। মক্কার অধিবাসীদের মত তারা তেমন উগ্র ও রুক্ষ্ম প্রকৃতির ছিল না। এদের আচার-ব্যবহার ও স্বভাব-চরিত্রও তুলনামূলকভাবে ভদ্রতাসুলভ ছিল। 


অবশ্য জাহেলিয়াত বা মূর্খতার দিক দিয়ে মদিনার অধিবাসীগণও কোন অংশে কম ছিল । এরা একদিকে আল্লাহকে বিশ্বাস করত, অন্যদিকে নানা দেব দেবী প্রতিমাকে পূজা করত। এ শ্রেণীর লােকগণ ব্যতীত মদিনায় আর এক শ্রেণীর লােক ছিল তারা উপজাতি হলেও পুরুষানুক্রমিক-ভাবে যুগ যুগ ধরে মদিনায় বসবাস করে আসছিল। 


এরা ছিল ইয়াহুদী সম্প্রদায়। এরা যদিও নিজদিগকে হযরত মূসা (আ)-এর উম্মত এবং তৌরাত গ্রন্থের অনুসারী বলে দাবি করত, কিন্তু আসলে তারা হযরত মূসা (আ) বা তৌরাত গ্রন্থের কোন একটি নির্দেশই পালন করত । এরা মনগড়া ধর্ম সৃষ্টি করে তদনুযায়ীই নিজের পরিচালিত হত। হযরত মুসা (আ)-এর প্রতি অবতীর্ণ মূল তৌরাতের বিভিন্ন স্থানে এরা পরিবর্ধন পরিবর্তন ও পরিমার্জন করে তৌরাতকে এমন পর্যায়ে পৌছেছিল যে, আসলে তৌরাতের সাথে তার কোন সম্পর্কই নেই। 


ইয়াহুদী জাতিটি বড়ই সুচতুর জাতি। এরা ব্যবসা-বাণিজ্য করে বিশেষত সুদের কারবার দিয়ে অর্থোপার্জন করত। পৌত্তলিকদের অপেক্ষা এরা ধনী ও স্বচ্ছল ছিল। এরা স্থানীয় অজ্ঞ ও মূর্ণ অধিবাসীদের মধ্যে কৌশলে বিবাদ সৃষ্টি করে তাদের ওপর নিজেদের প্রাধান্য বিস্তার করেছিল। এরা গরিব কৃষক সমাজের মধ্যে সুদের বিনিময়ে ঋণ প্রদান করত এবং সুদসহ মূলঋণের মােট চার-পাঁচ গুণ টাকা আদায় করে নিয়ে নিজেরা ধনবান হত এবং গরিব কৃষককুলকে আরও বেশি গরিব বানিয়ে ফেলত।


 এরা। মদিনার একেবারে আদিম অধিবাসী হলেও বহিরাগত হিসেবে ছিল অতিশয়। প্রাচীন। বহুকাল যাবত বাস করার ফলে এরাও মদিনার স্থায়ী অধিবাসীরূপে পরিণত হয়েছিল। স্থানীয় বর্বর অধিবাসীদেরকে নানা বিপর্যয়ের মধ্যে ফাসিয়ে দিয়ে পরে এরাই আবার তাদের ওপর মাতব্বরী করত। ইয়াহুদীরা ব্যতীত মদিনায় আরও একটি বহিরাগত দল বাস করত। এরা ছিল খ্রিস্টান। 


খ্রিস্টানদের রীতি-নীতি ও আচার-ব্যবহার ইয়াহুদীদের অপেক্ষা অনেক সদয়, ভদ্র ও নম্র ছিল। কিন্তু ধর্মীয় দিক দিয়ে তাদের মতামত ও মতবাদ অত্যন্ত অযৌক্তিক ও অবাস্তব ছিল। তাদের কেউ কেউ হযরত ঈসা (আ)-কে স্রষ্টার পুত্র ও কেউ কেউ বা হযরত ঈসা (আ) ও বিবি মরিয়মকে বিভিন্ন ক্ষমতায় স্রষ্টার অংশীদার মনে করত। 


মদিনার ওয়াহাব যুহরীর আর্থিক অবস্থা মােটামুটি স্বচ্ছল ছিল। সাধারণ ধনী বলতে যে পরিমাণ অর্থ থাকার প্রয়ােজন, ওয়াহাব যুহরীর সে পরিমাণ ধন-সম্পদই ছিল। তার সংসারে কোন প্রকার অনটন ছিল । সংসারে একমাত্র স্ত্রীকে নিয়ে তিনি বেশ সুখেই কাল কাটিয়েছিলেন। কিন্তু আর্থিক স্বচ্ছলতার সুখ যথেষ্ট থাকলেও একটি দিক দিয়ে তারা মােটেই তৃপ্ত ছিলেন না। বিবাহের পরে দীর্ঘদিন ধরেও তাদের কোন সন্তান-সন্ততি না হওয়াই এ অতৃপ্তির মূল কারণ। 


এরূপ সন্তানহীন দম্পতির মনে যে অশান্তি ও অতৃপ্তির জ্বালা পুঞ্জিভূত থাকে তা শুধু ভুক্তভােগিরাই বুঝতে পারে। একটি সন্তানের অভাবে সত্যিই ওয়াহাব দম্পতির যাবতীয় সুখ ও শান্তি এবং ধন-দৌলত ব্যর্থ হয়ে উঠেছিল । সুন্দর বাড়িঘর ও আরামের উপকরণাদি ক্রমেই তাদের কাছে বিরক্তিকর ও মূল্যহীন হয়ে যাচ্ছিল। অবশেষে তারা মানত করলেন, আল্লাহ যদি তাদেরকে একটি পুত্র সন্তান দান করেন তবে তারা স্বামী-স্ত্রী উভয়ই মক্কায় গিয়ে পবিত্র গৃহ খানায়ে কাবায় হজ্জ করে আসবেন। 


উল্লেখ থাকে যে, তখনকার দিনে হজ্জ করার অর্থ ছিল পবিত্র কা'বা গৃহ যিয়ারত ও তাওয়াফ করা এবং কা'বা গৃহে রক্ষিত দেব-দেবী ও এতিমাদের সম্মুখে ভােগ্য-দ্রব্যসমূহ স্থাপন করে সাষ্টাংগে প্রণাম করা। আর সুগতের অসংখ্য লােকই তখন এভাবে বিভিন্ন পার্থিব উদ্দেশ্য সফল করতে হজ্জ আদায় করত। পূর্ব পুরুষদের প্রথা এবং প্রচলিত নিয়মানুযায়ী ওয়াহাব দম্পতিও দেবদেবীদের পূজা করতেন। 


তথাপি প্রকৃত স্রষ্টা সর্বশক্তিমান নিরাকার প্রভুর প্রতি তাদের আন্তরিক বিশ্বাস ছিল। বস্তুত আরবের সে অন্ধকার যুগেও সেখানে দু-চারজন এমন ছিলেন যাদের স্বভাব-চরিত্র ছিল উন্নত, আচার-ব্যবহার ছিল নম্র, ভদ্র এবং পরিমার্জিত। তাদের হৃদয় মধ্যে আল্লাহ তায়ালার প্রতি ছিল অসীম ভক্তি ও বিম্বাস। যদিও তারা বিশ্বাসী ছিলেন। ওয়াহাব দম্পতি ছিলেন। আরবের এ শ্রেণীর পৌত্তলিক। 


পরম করুণাময় আল্লাহ তায়ালা ওয়াহাব দম্পতির প্রার্থনা মঞ্জুর করলেন। ওয়াহাবের স্ত্রী কিছুদিনের মধ্যেই গর্ভবতী হলেন। স্বামী-স্ত্রীর মন আশায় আনন্দে ভরে উঠল। তারা আল্লাহর উদ্দেশ্যে অশেষ শােকর জ্ঞাপন করলেন। যথাসময়ে তাদের গৃহ আলাে করে ফুটফুটে চন্দ্রের মত একটি কন্যা সন্তান আগমন করল। কন্যা সন্তানের প্রতি বিরাগ এবং তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যতা মদিনার পৌত্তলিকদের মধ্যেও প্রচলিত ছিল। তারাও সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশু কন্যাকে জীবন্ত কবরে প্রােথিত করত কিন্তু মদিনার ওয়াহাব দম্পত্তি দীর্ঘ দিন ধরে সন্তান লাভে বঞ্চিত ছিল। 


একটি সন্তান লাভের জন্য তারা ব্যাকুলভাবে আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করেছিলেন। তাই কিনা ভূমিষ্ঠ হবার পরে তাকে গােসল করিয়ে বস্ত্রাবৃত করত যখন এনে ওয়াহাবের কোলে দিল, ওয়াহাব চক্ষু উঠিয়ে একবার শিশু কন্যার প্রতি দৃষ্টিপাত করলেন। আনন্দে তাঁর বক্ষ ভরে গেল। সন্তানহীনতার দগ্ধ হৃদয়ের ক্ষত তার মুহূর্তে যেন শুকিয়ে গেল। আনন্দের আতিশয্যে তিনি বার বার সন্তানটির সােনালি গণ্ডে চুম্বন করতে লাগলেন। ওয়াহাব ভুলে গেলেন দেশের প্রচলিত প্রথা। ভুলে গেলেন তিনি কন্যা সন্তান জন্মজনিত অপমানের কথা। মুহূর্তের জন্যও তার মনে হল না নবজাত কন্যাকে গলা টিপে হত্যা করা বা জীবন্ত কবর দেয়ার কথা। 


কন্যার জন্য ওয়াহাবের হৃদয় মধ্যে মমতার বান ডাকল। কন্যা সন্তান লাভ করার পর ওয়াহাবের সংসারে যে পরিপূর্ণ শান্তি ও সুখের জোয়ার প্রবাহিত হল তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নহে। জনশ্রুতি আছে, ওয়াহাবের পত্নী যখন গর্ভবতী তখন একদা স্বপ্নে দেখছিলেন, এক শুভ্রবেশ পরিহিত দরবেশ এসে তাঁকে এক অপূর্ব সংবাদ শুনিয়ে গেলেন। নামকরণ স্বপ্নে দেখা দরবেশ ওয়াহাবকে লক্ষ্য করে বলতে লাগলেন, ওয়াহাব! তুমি জগতের বুকে অদ্বিতীয় ভাগ্যবান ।


 ভবিষ্যতে এমন একজন মহাপুরুষের সঙ্গে তােমার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপিত হবে, যিনি হবেন জগতে সর্বশ্রেষ্ঠ মহাপুরুষ যিনি হবেন বিশ্বমানবকুলের জন্য আল্লাহর রহম স্বরূপ ও সাক্ষাৎ মুক্তিদূত আরবের লােকগণ তার গুণে মুগ্ধ হয়ে বাল্যকালেই তাঁকে ‘আল-আমীন উপাধিতে ভূষিত করবেন। মানবকুলের মুক্তি ও আমানতের দায়িত্ব স্কন্ধে নিয়ে তিনি ধরাধামে আগমন করবেন। সে মহাপুরুষেরই গর্ভধারিণী হবেন তোমার ঔরসজাত ও তােমার পত্নীর গর্ভজাত দুহিতা।


 তুমি তােমার সে ভাবী কন্যার নাম রেখ আমেনা। এ স্বপ্ন দেখে ওয়াহাব যুহরীর মনে এক অভূতপূর্ব খুশি পুলকের হিল্লোল বইতে লাগল। তিনি বুঝতে পারলেন, করুণাময় ও প্রভু তার ওপর যারপর নাই প্রসন্ন হয়েছেন এবং অচিরেই তিনি তাকে এক সেরা ভাগ্যবতী কন্যা দান করবেন। বস্তুত ওয়াহাব যুহরী তাঁর কন্যা ভূমিষ্ঠ হলে স্বপ্নের এই নির্দেশ অনুযায়ী তার নাম রাখলেন ‘আমেনা'। চরিত্রে অদ্ভূত স্বাতন্ত্র। শৈশবকাল হতেই আমেনার চরিত্রে এমন কতগুলাে আশ্চর্য ও অস্বাভাবিক। গুণ পরিলক্ষিত হতে লাগল, যা দ্বারা অন্য যে কোন বালিকার চরিত্রের সাথে তাঁর।


 প্রকাশ্য স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যাবলি মূর্ত হয়ে উঠল। অত্যন্ত শান্ত-শিষ্ট, ধীর-স্থির, মিষ্টভাষিণী ও সত্যবাদিনী বালিকা আমেনার চরিত্রে নানারূপ শুভ লক্ষণসমূহ প্রত্যক্ষ করে আত্মীয়, পাড়া-প্রতিবেশি সকলেই তাঁকে অতিশয় স্নেহ করতে লাগল। তার পিতা-মাতা ঐ লক্ষণসমূহ দেখেই অচিরেই বুঝতে পারলেন যে, তাদের এ ভাগ্যবতী কন্যাটি নিশ্চয়ই ভবিষ্যতকালে একজন মহীয়সী মহিলায় পরিণত হবে। ওয়াহাবের আর বুঝতে বাকি রইল না যে, তাঁর স্বপ্নে দেখা মহাপুরুষের কথাগুলাে সম্পূর্ণই সত্যে পরিণত হবে। 


কথিত আছে, বিবি আমেনা। যখন ছয় কি সাত বছরের বালিকা মাত্র, তখন একদা এক বান্ধবীর বাড়ি বেড়াতে যাওয়ার পথে তাঁদের গৃহের সন্নিকটে একটি অত্যুজ্জ্বল স্বর্ণমুদ্রা দেখতে পেলেন। আমেনা মুদ্রাটি তুলে নিলেন। কিন্তু পর মুহূর্তেই তিনি চিন্তা করলেন, কি জানি তা কার মুদ্রা, তা হাতে উঠিয়ে নিয়ে তার ঠিক হয় নি। পরের জিনিস, তা হারানােই হােক বা যা হােক না কেন গ্রহণ করা অন্যায় বটে। যে এটা হারিয়েছে নিশ্চয় সে এর অনুসন্ধান করতেছে। হয়ত সে অনুসন্ধান করতে করতে এখানেও আসবে ।


 তা যথাস্থানে পড়ে থাকতে দেখে সে নিজের জিনিসটি তখন পেতে পারবে। এরূপ ভেবে সে দীনারটি যেখানে পড়েছিল, সেখানেই রাখতে গেল, কিন্তু হঠাৎ আবার তার মনে খেয়াল হল যে, জিনিসটি মূল্যবান, তাই ওখানে রেখে দিলে হয়ত উহা মালিকের হাতে না পড়ে অন্যের হাতেও পড়ে যেতে পারে। কারণ পথের উপরে তা পড়ে থাকলে যে দেখবে সে-ই তুলে নিয়ে যাবে। অতএব, তা ওখানে ফেলে রাখা ঠিক হবে না। তার চেয়ে এটা নিজের নিকট রেখে অনুসন্ধান করে দেখা উত্তম যে, দীনারটি হারিয়েছে কে ? অতঃপর । আমেনা দীনারটি হাতের মুঠায় নিয়েই তার বান্ধবীর ঘরে গেলেন এবং তার।দীনারটি কুড়িয়ে পেয়েছি। বলত এখন এটা কি করা যায় ? কিভাবে এর প্রকৃত সাথে সাক্ষাৎ করে বললেন, বােন! 


তোমাদের গৃহে আসরি কালে অামি পথে এ। মালিককে বের করে এটা তাকে ফিরিয়ে দিতে পারি ? আমেনার কথা শুনে তার। সহচরী বলল, আরে তুমি এ ব্যাপারে এত ব্যস্ত হয়েছ কেন, কতজনেরই তাে। কত সময় কত জিনিস হারিয়ে যায়। হারান জিনিস আবার কেউ কি কখনও। ফেরত পায় নাকি ? আর পথের উপরে পাওয়া জিনিস ফেরতই বা কে কবে দেয়নি? তুমি একটি আন্তবােকা, আমেনা! আমার কথা শুন বােন, চলাে আমরা দোকানে গিয়ে এর দ্বারা ভাল কিছু জিনিস কিনে খাই আর মনের মত কতগুলাে। সখের খেলনা কিনি। 


আমেনা দেখলেন, তাঁর বান্ধবীর মত মােটেই ভাল নয়। তিনি তার কথায় মােটেই রাজি হলেন না; বরং তাকে বললেন, না বােন, দীনারটির মালিককে খুঁজে বের করে তাকে এটা ফিরিয়ে দেয়া দরকার। তিনি মনে মনে স্থির করলেন, বাড়ি গিয়ে পিতা-মাতার কাছে দীনারটির কথা বলবেন এবং তাদের দ্বারা এর মালিকের খোঁজ করিয়ে দীনারটি তার হাতে ফিরিয়ে দিবেন। আজ আমেনার মনে বড় অস্বস্তি লেগেছিল। 


তিনি আর বিলম্ব না করে নিজেদের বাড়ি অভিমুখে চললেন। পথে বের হয়ে কিছু দূর চলেই দেখলেন, জনৈক বৃদ্ধ লাঠি ভর দিয়ে ধীরে ধীরে এদিকে এগিয়ে আসছে আর সে চোখের দৃষ্টি নিচু করে পথের উপরে কি যেন খুঁজতে খুঁজতে অগ্রসর হচ্ছে। বৃদ্ধের গতি-বিধি ও চোখ-মুখের অবস্থা দেখে আমেনার আর বুঝতে বাকি রইল না যে, এ বৃদ্ধ লােকটিই দীনারটি হারিয়েছে। তিনি বৃদ্ধের নিকটবর্তী হয়ে কোমল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, চাচাজী! এ পথে আপনি কি কিছু হারিয়ে ফেলেছেন ? বৃদ্ধ লােকটি উত্তর করল, আমার একটি স্বর্ণ দীনার এ রাস্তার ওপরই কোনখানে যেন পড়ে গিয়েছে। 


দীনারটি বড় কষ্টে আমি সঞ্চয় করেছিলাম। পর পর তিনদিন অনাহারে কাটিয়ে অবশেষে বাধ্য হয়ে আজ সে সঞ্চিত মুদ্রাটি নিয়ে কিছু খাবার কিনে আনতে বাজারের দিকে যাচ্ছিলাম। কিন্তু মা ! আমার এমনি দুর্ভাগ্য, রাস্তায় চলাকালে না জানি কোথায় কেমন ভাবে দীনারটি পড়ে গিয়েছে এখন আমার গৃহে এমন আর কোন সম্বলই নেই যদ্বারা একটি দিনেরও মাত্র খােরাক জোগাড় করতে পারি।  এখন নিশ্চয় আমাকে গৃহের সকলকে নিয়ে অনাহারে মরতে হবে। বৃদ্ধের এ করুণ উক্তি শুনে ও তার বিষন্ন বদন দেখে কিশােরী আমেনার কোমল হৃদয় ব্যথিত হয়ে উঠল।


 তিনি বৃদ্ধের হাত ধরে তাকে বাড়ি নিয়ে আসলেন এবং তার জননীর কাছে বলে সযত্নে তাকে পেট ভরে আহার করালেন। তার এরূপ যত্ন লাভ এবং তৃপ্তি সহকারে ক্ষুন্নিবৃত্তি তাকে দীনারের কথা একরূপ। ভুলে নিয়েছিল। তাছাড়া কোন কিছু হারিয়ে গেলে তা আর পুনরায় পাওয়া যায় না, এরূপ ধারণ করেই বৃদ্ধ বিদায় হওয়ার উদ্যোগ করল এবং বিদায় গ্রহণকালে তার প্রতি আমেনার এরূপ সদাশয়তার বিনিময়ে তাকে বৃদ্ধ প্রাণ ভরে দোয়া করল। অতঃপর সে উঠে দাঁড়িয়ে পা বাড়িয়ে ঠিক এমনি সময় আমেনা বললেন, চাচাজী! আমি আপনাকে যেজন্য এখানে ডেকে এনেছি তা তাে বলা হয় নি দেখুন তাে, এ দীনারটি আপনার কি না ? 


এ কথা বলে আমেনা দীনারটি তার হাতে দিলেন। বৃদ্ধ দীনারটি হাতে নিয়ে সানন্দে বলে উঠল, হ্যাঁ মা, এ দীনারটিই হারিয়ে গিয়েছিল। এ তাে বহুদিন ঘরে রাখার ফলে তার কোণায় যে দাগটি পড়েছিল, তা দেখা যাচ্ছে। আমেনা বললেন, বেশ তাে চাচাজী, এবার আপনার দীনারটি আপনি নিয়ে যান। আমি যে এ বস্তুটি আপনার হাতে তুলে দিতে পারলাম এজন্য আমি আনন্দ লাভ করেছি, যা আপনাকে বুঝিয়ে বলতে পারব না। বৃদ্ধের নেত্রযুগল হতে আনন্দের অশ্রু গড়িয়ে পড়ল । সে বলল, মা! তুমি দীর্ঘজীবী হও। 


এতটুকু বয়সেই তুমি যে সততা অর্জন করেছ, তা তােমাকে সৌভাগ্যবতী করে তুলবে। মা ! আমি প্রাণ ভরে আশীর্বাদ করছি, তুমি বিশ্ব মানবকুলে অমর লাভ কর। জগদ্বাসী যেন সদা-সর্বদা তােমার নামটি স্মরণ করে। বৃদ্ধ আনন্দাপুত মনে আমেনার মাথায় হাত রেখে এরূপ আশীর্বাদ করে বিদায় হয়ে গেল। এ ঘটনায় আমেনাকে আশীর্বাদ শুধু বৃদ্ধ লােকটি একাই করল , আমেনার পিতা-মাতা কন্যার এ সততা এবং মহত্ত্ব গুণটি প্রত্যক্ষ করে মনে মনে গর্ব অনুভব করলেন এবং তারা উভয়ে তাদের প্রাণ ভরে কন্যার জন্য প্রভুর দরবারে দোয়া করলেন।


বিবাহের সংকেত

এতদিন কিশােরী আমেনা যুবতীতে পরিণত হয়েছেন। তাঁর বিবাহের বয়স দ্বারস্থ হয়েছে। সুতরাং বিবি আমেনা এখন পূর্ণ বিবাহযােগ্য। আরবের সে বর্বর বা পাশব যুগের ঘটনা ইতােপূর্বেই আমরা উল্লেখ করেছি। সে যুগে তথায় কোন গৃহে বিবাহযােগ্য কন্যা থাকা যে কত বড় সমস্যার কথা ছিল তা ভাষায় প্রকাশ করা দুঃসাধ্য ব্যাপার। তদুপরি যদি কন্যা সুন্দরী হত তবে তাে আর কথাই ছিল। ঐ কন্যার পিতা-মাতার উপরে নেমে আসত ভীষণ অশান্তি ও দুশ্চিন্তার অভিশাপ।


 ভয়-ভীতি ও শত দুর্যোগ-দুর্বিপাকের ঝামেলা এসে উপস্থিত হত তাদের উপরে। সে যুগে এ ধরনের কন্যাদের ইজ্জত বা সতীত্ব টিকিয়ে রাখা ছিল কল্পনারও অতীত। যে যুগের বর্বর পুরুষগুলাে শুধুমাত্র জননীকে বাদ দিয়ে কন্যা, ভগ্নি প্রভৃতি প্রায় প্রতিটি নারীর সাথে অবাধে যৌন মিলন ঘটাতে পারত, সে যুগে অন্য নারীরা কেমন করে সে পণ্ড প্রকৃতির পুরুষদের হাত হতে নিজেদেরকে বাঁচিয়ে রাখবে? কিন্তু তখনকার আরবের অবস্থা এ দিক দিয়ে। যতই শােচনীয় হােক না কেন, আল্লাহর সেরা সৃষ্টি নবী-রাসূলের সরদার হযরত আসলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যিনি মাতা হবেন, তার ইজত।


 সম্মান রক্ষার ভার স্বয়ং আল্লাহ তায়ালাই গ্রহণ করেছিলেন। আর এ কারণেই হয়ত আল্লাহ তাকে আরবের অভিজাত কুরায়েশ বংশে প্রেরণ করেছিলেন। এতে ফায়েদা ছিল যে, আরবে ব্যাপক ব্যভিচার থাকা সত্ত্বেও কোন অভিজাত বংশের নারীদের প্রতি অন্যান্য বংশের পুরুষ কিংবা স্ববংশীয় পুরুষেরাও সহজে কুদৃষ্টি প্রদানে সাহসী হত না। বিশেষত বিবি আমেনা তাে ছিলেন মদিনার অতি উচ্চ বংশীয়া নারী। তদুপরি তাঁর জনক ওয়াহাব যুহরী কুরায়েশ সমাজে যথেষ্ট প্রভাব প্রতিপত্তিশালী লােক ছিলেন। 


তাই তার কন্যা আমেনা বিবি যে অতি সহজেই স্বীয় সম্মান রক্ষা করে চলতে পারবেন তাতে আর বিচিত্র কি ? অধিকন্তু বিবি আমেনা শৈশব হতেই নিজে তাে ছিলেন পূতঃ চরিত্র । পবিত্রতা রক্ষার ব্যাপারে চেষ্টা ও যত্নের দিক দিয়ে তাঁর মত মহিলা সে যুগে দ্বিতীয়টি ছিল না বলে অত্যুক্তি হবে না। আল্লাহ্ নিজের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠত্ব রক্ষা এবং তাঁকে নিখুঁত করার উদ্দেশ্যেই বিবি আমেনাকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র এবং নিস্পাপ রেখেছিলেন। আমেনা যৌবনে পৌছা মাত্র পিতা ওয়াহাব যুহরী তাঁকে পাত্রস্থ করার জন্য চেষ্টিত হলেন। 


এ জন্য তার আত্মীয়-স্বজনগণ দেশ-বিদেশে সৎ পাত্র খুঁজতে শুরু করলেন। বহু পাত্রই পাওয়া গেল; অনেক কবিলা হতে সুযােগ্য, উত্তম ও ধন-সম্পদশালী পাত্রের পক্ষ হতে প্রস্তাব জুটল, ওয়াহাব যুহরীর ন্যায় প্রভাবশালী পরিবারের সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করতে অনেকেই আগ্রহ প্রকাশ করল, কিন্তু কোন প্রস্তাবেই যেন কেন কি জানি ওহাব যুহরীর মন ঝুঁকল না। কোন পাত্রেরই ধন-মান-গৌরবে তিনি আকৃষ্ট হলেন না। কোন কোন পাত্রের সপক্ষে ওয়াহাব যুহরীর নিজ আত্মীয়গণ তাঁকে চাপ দিল, সুপারিশ করল কিন্তু তাদের কথাও তিনি মানলেন না। মােটকথা, কন্যা বিবাহ দানের ব্যাপারে কোন এক অজানা পাত্রের দিকে যেন তাঁকে এক অদৃশ্য শক্তি হাতছানি দিচ্ছিল । 


সুতরাং সে সুনির্দিষ্ট পাত্র ব্যতীত অন্য যে কোন পাত্র তার পছন্দই বা হবে কেন, আর তার সাথে নিজের কন্যা বিবাহ দিবেনই বা কিরূপে ? জনশ্রুতি রয়েছে যে, বিবি আমেনা তাঁর পিতাকে বলেছিলেন, পিতঃ! আমি যেখন কোন নির্জন স্থানে যাই তখন অদৃশ্য আওয়াজ। শুনতে পাই কে যেন আমাকে বলে, হে রাসূল জননী! তােমাকে সালাম। আবার। কখনও বা বলে, হে নবীদের সরদারের জননী! তোমাকে সুসংবাদ। সম্প্রতি | একটি নতুন কথা শুনতে পেলাম। ঠিক একইরূপে কে যেন আমাকে বলল, হে  আবদুল্লাহ সহধর্মিনী ! ধন্যবাদ নাও। 


বিবি আমেনার এ কথাগুলাে পিতা ওয়াহাব।যুহরী মনােযােগ সহকারে শুনলেন বটে, কিন্তু এর কোনই গুরুত্ব না দিয়ে আরবের তৎকালীন কুসংস্কার অনুযায়ী একে জ্বিন ও ভূত-প্রেতের কাণ্ডকারখানা মনে করলেন। তাই আর ভবিষ্যতে যাতে এরূপ না হয় তজ্জন্য তিনি অনেক তন্ত্র-মন্ত্র জানা ওঝা-ফকীরদের শরণাপন্ন হলেন। কিন্তু এ সব ব্যবস্থা ও তদবীরাদিতে কোন ফলােদয় হল না; বরং বিবি আমেনাকে কেন্দ্র করে ওয়াহাব যুহরীর গৃহে নানা অলৌকিক ঘটনা ঘটতে লাগল। অবশেষে ওয়াহব যুহরী একদা গভীর রাতে স্বপ্ন দেখলেন যে, এক সম্মানিত পুরুষ তাঁকে বললেন, হে ওয়াহাব! তুমি সাবধান হও। 


তােমার কন্যার উপরে তুমি আর কোন মন্ত্র-তন্ত্র প্রয়ােগ করাে। স্বয়ং আল্লাহ যার তত্ত্বাবধান ও নিরাপত্তার ভার গ্রহণ করেছেন, তুমি তাকে এমন এক উত্তম ও সদ্বংশবান পাত্রের নিকটে সমর্পণ কর, যাকে কোরবানী করার জন্য তাঁর পিতা সংকল্প করেছে এবং আল্লাহ্ও তার কোরবানী মঞ্জুর করেছেন। স্বপ্ন দেখে আবদুল ওয়াহাব যুহরী বিচলিত হয়ে পড়লেন। তিনি বুঝতে পারলেন যে, তা নিশ্চয় স্বপ্ন নয়; বরং স্বপ্নের মাধ্যমে কোন এক সুপ্ত শক্তির কঠোর নির্দেশ। যেভাবে হােক এটা তাকে পালন করতে হবে । 


কিন্তু সমস্যা হল যে, যার দিকে ইঙ্গিত করা হচ্ছে, সে পাত্রটি কে এবং কোথায় ? আর এমন পাত্রকে খুঁজে বের করেই কি লাভ হবে যাকে অবশ্যই কোরবানী করা হবে। তার নিকট কন্যা বিবাহ দিয়ে কন্যার জীবনটাই তাে ব্যর্থ করে দেয়া হবে। এরূপ ভাবনা-চিন্তা।করে কোন কিছু স্থির করতে না পেরে ওয়াহাব যুহরী বিশেষ চিন্তিত অবস্থায়ই কাল কাটাতে লাগলেন।


আবদুল্লাহ্ ও আমেনার শুভ পরিণয়

আবদুল মুত্তালিব ও ওয়াহাব যুহরীর মধ্যে পূর্ব হতেই পরিচয় ছিল। এ পূর্ব পরিচয়ে সূত্র ধরে তাদের মধ্যে আত্মীয়তার সম্পর্কের সূত্রপাত হয়। যদিও তাদের একজন মক্কা ও অন্যজন মদিনার অধিবাসী তবু তারা উভয়ে একই বংশীয় এবং পরস্পর বাল্যবন্ধু ছিলেন । একবার ওয়াহাব যুহরী হজ্জ উপলক্ষে মক্কায় গিয়ে আবদুল মুত্তালিবের সঙ্গে সাক্ষাত করলেন এবং বহুদিন পরে দুই বন্ধুর সাক্ষাত হওয়ায় অনেক বিষয় নিয়ে আলাপ-আলােচনা করলেন। ওয়াহাব যুহরীর মনে এক বিশেষ উদ্দেশ্যও ছিল । 


তিনি তার কন্যার বিবাহ কাজ এখনও পর্যন্ত সমাধান করতে পারেন নি। আবদুল মুত্তালিবের পুত্র কোরবানীর মানত এবং কোরবানী সম্পর্কিত সর্বশেষ ঘটনা সবই তিনি মদিনায় বসেই শুনেছিলেন। তাই তাঁর অন্তর মধ্যে একটি প্রচ্ছন্ন আকাংখাও বিদ্যমান ছিল। তবে তা সরাসরিভাবে প্রকাশ করতে কেন যেন তার সঙ্কোচ হচ্ছিল। তাই তিনি সেরূপ কিছু না বলে প্রকারান্তরে নিজ কন্যা আমেনার কথা উপস্থাপন করলেন। তিনি বললেন, আমার একটি কন্যা বিবাহযােগ্যহয়েছে। তাকে এখন পাত্রস্থ করা দরকার। 


অথচ যােগ্য পাত্র পাওয়া যাচ্ছে না, এ যাবত যেসব প্রস্তাব এসেছে, এর কোনটিই তার মনােমত হয় নেই। শুনে আবদুল।  মুত্তালিব বললেন, তবে তাে ভালই তােমার কন্যাকে না হয় আমার পুত্র। আবদুল্লাহর কাছেই বিবাহ দাও ভাই! আমার কনিষ্ঠ পুত্র আবদুল্লাহর কথা হয়ত। শুনে থাকবে। স্বভাব ও বুদ্ধিমত্তায় সে সবার প্রশংসনীয়। নিজের পুত্রের গুণ। প্রকাশ করা ঠিক নয় বটে, তবু সত্য বলতে আপত্তি কিসের ? আমার পুত্র। তোমার কন্যার জন্য উত্তম পাত্র হবে। 


ইচ্ছা হলে তুমি আমার সাথে বৈবাহিক। সম্পর্ক স্থাপন করতে পার। আবদুল মুত্তালিবের এ বিবাহ প্রস্তাবটি ওয়াহাব যুহরীর কাছে কত যে খুশীর বিষয় ছিল তা ভাষায় প্রকাশ করা অসাধ্য ব্যাপার। তাঁর মনে হতে লাগল যে, নিশ্চয়ই এ স্থানে কন্যা আমেনার বিবাহ হবে এতে কোন সন্দেহ নেই। বিশেষত আবদুল মুত্তালিবের মুখে যখন তিনি শুনলেন যে, তাঁর পুত্রটির নাম আবদুল্লাহ, তখন তিনি সেই কথা স্মরণ করে আরও বেশি আশান্বিত হলেন যে, একদা কন্যা আমেনা বলেছিল, আব্বা!


 আমি যখন কোন নির্জন স্থানে যাই তখন অদৃশ্য হতে কে যেন আমাকে সম্বােধন করে বলে, “হে আবদুল্লাহর সহধর্মিণী, হে রাসূল জননী! তুমি ছালাম গ্রহণ কর। আবদুল মুত্তালিবের এ ছেলেটির নামও আবদুল্লাহ। মােটকথা ওয়াহাব যুহরীর নিকট প্রস্তাবটি সব দিক দিয়েই খুশী ও আনন্দের কারণ হয়েছিল। একে তাে আবদুল মুত্তালিবই মক্কার কুরায়েশদের সরদার, আল্লাহ্র গৃহ খানায়ে কা'বার তত্ত্বাবধায়ক ও বিদেশাগত হজ্জ যাত্রীদের যত্ন ও নিরাপত্তা রক্ষাকারী । তদুপরি তিনি মক্কার সকল কুরায়েশদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা অভিজাত এবং মর্যাদাশালী শাখা হাশেমী গােত্রের লােক। 


এদের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করতে পারা মক্কা ও মদিনার যে কোন কুরায়েশ গােত্রের জন্য গৌরবের কথা। ওয়াহাব যুহরী আর কোনরূপ ইতস্তত বা দ্বিধা না করে আনন্দে আবদুল মুত্তালিবের প্রস্তাব গ্রহণ করলেন। বিবাহের তারিখও তখন নির্ধারিত হল । সে যুগে বিবাহের রীতি ছিল, পাত্র ও পাত্রীর জন্য দেশের শাসক কিংবা কওমের প্রধান সরদারের নিকট হতে বিবাহের অনুমতি গ্রহণ করতে হত। কিন্তু এক্ষেত্রে আবদুল্লাহ ও আমেনার সে রীতি মেনে চলার কোন প্রয়ােজন হল না। কারণ আবদুল্লাহ ছিলেন আবদুল মুত্তালিবের পুত্র এবং তিনিই ছিলেন মক্কার শাসনকর্তা। 


আবদুল্লাহর বিবাহের প্রস্তাব তিনি দিয়েছিলেন এবং ওয়াহাব যুহরী। সাথে সাথে তা গ্রহণও করেছিলেন। সুতরাং রাজা বা শাসকের অনুমতি তাে এ। দু পক্ষের প্রস্তাব ও স্বীকৃতির মধ্য দিয়েই হয়ে গিয়েছিল। তার জন্য অন্য কোনরূপ কিছু করার দরকার ছিল না। অতঃপর নির্দিষ্ট তারিখে উভয় পক্ষের।অভিভাবক ও আত্মীয়-স্বজন মহা ধুমধাম ও আনন্দের সাথে পাত্র-পাত্রী নিয়ে।  আল্লাহর গৃহ খানায়ে কাবায় উপস্থিত হলেন এবং তৎকালের রীতি অনুসারে। দেবতাদের সমক্ষে বিবাহ অনুষ্ঠান সম্পন্ন করলেন। 


এভাবে দেবতাদের সম্মুঙ্গে। এসে বিবাহ অনুষ্ঠান সম্পন্ন করাকে তখন বরকতের নিদর্শন এবং দাম্পত্য পারিবারিক জীবনে পাত্র-পাত্রীর সুখী হবার প্রধান উছিলা হিসেবে মনে করা হত তবে, এ প্রথা কেবল ধনীদের দ্বারাই প্রতিপালিত হত, কারণ এতে ভেজানুষ্ঠান এভূতি বাবত বহু খরচের প্রযােজন হত । এটা গরিবদের পক্ষে সম্ভব হত না। সুতরাং তাদের মধ্যকার বিবাহ অনুষ্ঠানগুলাে রাজার নিকট হতে অনুমতি সংগ্রহের পর পাত্র বা পাত্রীর গৃহে বসেই অনুষ্ঠিত হত। 


বিবাহে তখন মােহরানার বালাই ছিল না, কারণ তখনও পর্যন্ত আরব সমাজে নারীর অধিকার ও মর্যাদা স্বীকৃত হয় নি, তারা তখন পুরুষদের সেবিকা মাত্র ছিল। তাদের ভরণ-পােষণের দায়িত্ব অবশ্য পুরুষ, অথবা নারীদের প্রতি অসহায় ও অবলা হিসেবে তাদের প্রতি কৃপাসুলভ কিছুটা দরদ প্রদর্শনের মত। আসলে যে নারীদের মােহরানার অধিকার, মাতৃ-পিতৃ সম্পত্তির অধিকার বা স্বামীর নিকট খােরাক-পােশাকের তেমন বাধ্যতামূলক অধিকার এ সবের কোন কিছুই তখন ছিল না।


 স্বামী গৃহে আসার পরে নারী স্বামীর নিকট হতে নিয়মিত ভরণ-পােষণ পেত সত্য, কিন্তু তা স্বীয় অধিকারে নয়, শুধু সেবিকার কাজ সাধন করে তার বিনিময়ে তা লাভ করত। বিবাহ অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দকে আবদুল মুত্তালিব মিষ্টি খেজুর এবং সেরা পানীয়ের দ্বারা আপ্যায়িত করেছিলেন। বিশেষত ধনী ও সম্ভ্রান্ত পরিবারে এ নিয়মটি প্রায় বাধ্যতামূলক ছিল। তা ছাড়া গরিব ও সাধারণ পরিবারেও তা সাধ্যানুসারে প্রতিপালন করা হত।



উত্তমতায় পরিপূর্ণ

আমেনা ও আবদুল্লাহ দম্পতি যুগলের মধ্যে উভয়ে ছিলেন গুণবান, গুণবতী, রূপবান-রূপবতী, বুদ্ধিমান-বুদ্ধিমতী । মােটকথা, দু'জনেই ছিলেন সর্বদিক দিয়ে উত্তম চরিত্র ও গুণের অধিকারী। সুতরাং একে অপরের গুণে মুগ্ধ এবং আকৃষ্ট ছিলেন পুরাপুরিভাবে। একজন আরেক জনকে বন্ধন করেছিলেন প্রীতি ও ভালবাসার রঞ্জু দ্বারা। মােটকথা, তাদের উভয়ে মধুময় দাম্পত্য জীবন-যাপন করছিলেন।


 পরস্পর গভীর প্রেম-ভালবাসার মধ্য দিয়েই তারা সাধন করে যাচ্ছিলেন পারিবারিক কর্তব্যসমূহ। যুগের প্রভাব এবং প্রচলিত রীতি অনুসারে তখন আরবে গৃহবধূরা নানা সময়েই স্বামীর হাতে নিগৃহীত হত এবং পদে পদে তাকে শ্বশুর-শাশুড়ী ও দেবর-ভাসুর দ্বারা লাঞ্ছিত ও অপমানিত হতে হত। কিভু কুরায়েশ গােত্রের বনু হাশেমী শাখায়ই এর বিপরীত অবস্থা ছিল। এদের কোন পরিবারে স্বামী তার স্ত্রীকে ঘৃণা বা অত্যাচার করত না এবং আত্মীয়গণও গৃহবধূরসাথে কোনরূপ দুর্ব্যবহারের প্রয়াস পেত না। 


গােত্রীয় সভ্যতার এই ধারা অনুসারেও সাইয়্যেদ আবদুল্লাহ স্ত্রী আমেনার সাথে অতি মধুর আচরণ প্রদর্শন। করতেন, বিনিময়ে তিনিও তার পক্ষ হতে আন্তরিক প্রেম ও উত্তম আচরণ লাভ। করতেন। এ দম্পতিযুগল দীর্ঘ পারিবারিক কিংবা দাম্পত্য জীবন যাপনে সক্ষম। হন নি। তবে যতদিন তারা একসাথে জীবন যাপন করেছিলেন, কোন দিনই তাদের মধ্যে সামান্য ঝগড়া বা কলহ দেখা যায় নি। সত্যি বলতে কি সে যুগের উৎখল জীবনযাপনে সুখী ও এরূপ শান্ত পারিবারিক জীবন যাপন অনভ্যস্ত ও অসুখী লােকেরাও আবদুল্লাহ ও আমেনার পারিবারিক সুখ অবলােকন করে হিংসায় জ্বলে উঠত আর বলত যে, সত্যই ওদের পরিবারটি সুখী পরিবারই বটে।


 বিবি আমেনা তাঁর অনুপম ব্যবহার দ্বারা শুধু স্বামীকেই যে খুশী করতেন তা নয়, বৃদ্ধ শ্বশুর-শাশুড়ীকে তিনি স্বীয় পিতা-মাতার অনুরূপ ভক্তি-শ্রদ্ধা করতেন। তারাও এ পুত্র বধূটিকে নিজেদের কন্যার মত স্নেহ ও আদর করতেন। শুনা যায়, আবদুল মুত্তালিব তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র আবদুল্লাহর স্ত্রী এ আমেনা বিবিকে এত ভাল জানতেন ও স্নেহ করতেন যে, তার নজীর এ বর্তমান যুগেও পাওয়া দুষ্কর। আরবে সে যুগে বিধবা বিবাহ প্রচলিত ছিল।


 বিবাহিতা যুবতী নারীর স্বামী অকালে মরে গেলে কিছুদিনের মধ্যেই সে নারী অন্য স্বামী গ্রহণ করত। কিন্তু বিবি আমেনার ক্ষেত্রে তার বিপরীত দেখা যায়। তিনি স্বামী আবদুল্লাহকে এমনই অধিক ভালবাসতেন ও তাঁর প্রতি এত অধিক অনুরক্ত ছিলেন যে, স্বামী আবদুল্লাহর পরলােক গমনকালে তিনি পরিপূর্ণ যুবতী ও অনুপম রূপলাবণ্য এবং দেহ সৌষ্ঠবের অধিকারিণী হওয়া সত্ত্বেও স্বামীর অবর্তমানে তিনি অন্য স্বামী গ্রহণ করার কল্পনা পর্যন্ত করেন নি। 


বিবি আমেনার আত্মীয়- স্বজন ও হিতাকাংখীগণ অনেকেই তাঁকে দ্বিতীয় বিবাহ করতে পরামর্শ দিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে এ সব পরামর্শ প্রত্যাখ্যান করেবৈধব্যকেই নিজের জন্য উত্তম বলে মেনে নিয়েছিলেন। অবশ্য সকলেরই জানা কথা যে, বিবি আমেনার এ বৈধব্য জীবন কম দীর্ঘ ছিল না, কিন্তু নারীর সমস্ত রূপ-রস রুচি ও বৃত্তিসমূহ নিজের মধ্যে রেখেই তিনি যেখানে যে কয়টি বছর সম্পূর্ণ নিষ্কলঙ্ক এবং পবিত্র জীবন যাপন করেছিলেন বিশেষত আরবের সে দুর্ধর্ষ পাশবিক আমলে তা জগতের ইতিহাসে চিরকালের জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।

''Related searches''

ইসলামিক সাধারণ জ্ঞান প্রশ্ন ও উত্তর, 

সরাসরি ইসলামিক প্রশ্ন ও উত্তর, 

ইসলামিক জটিল প্রশ্ন

ইসলামিক কুইজ প্রতিযোগিতা ২০২০, 

ইসলামিক প্রশ্ন জিজ্ঞাসা, গুগল প্রশ্ন ও উত্তর

ইসলামিক সাধারণ জ্ঞান প্রশ্ন ও উত্তর pdf

ইসলামিক প্রশ্ন উত্তর ওয়েবসাইট

ইসলামিক গল্প

নবীদের জীবনী

২য় পর্ব  দেখতে এখানে click করুন