হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর পিতামাতা আমিনা বিনতে ওয়াহব ও আবদুল্লাহর বিয়ে এবং হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর জন্মের ঘটনা।

 হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর পিতামাতা আমিনা বিনতে ওয়াহব ও আবদুল্লাহর বিয়ে এবং হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর জন্মের ঘটনা। 




আবদুল মুত্তালিব তাকে নিয়ে ওয়াহব ইবন আবদ মানাফ ইবন যুহরা ইবন কিলাব ইবন মুররা ইন কা'ব ইবন লুআই ইবন গালিব ইবন ফিহর-এর কাছে পেলেন। ইনি বংশ মর্যাদায় বনু যুহরা গােত্রের প্রধান ছিলেন। 

এই ওয়াহুবের কন্যা আমিনার সাথে আবদুল্লাহর বিয়ে সম্পন্ন হল । আমিনাও সমগ্র কুরায়শ বংশের সবচেয়ে মর্যাদাসম্পন্ন ও সম্ভ্রান্ত মহিলা ছিলেন। 


আমিনা বিনতে ওয়াহুবের মাতৃকূলের পরিচয়

 আবদুল উযযা ইবন উসমান ইবন আবদুদ্দার ইন কুসাই ইবন কিলাব ইবন মুররা ইব্‌ন কা'ব ইবুন লুআই ইবন গালিব ইকন ফির। আর বরকার।মাতার নাম উম্মে হাবীব বিনত আসাদ ইবন আবদুল উ্যা ইন কুসাই ইন কিলাব ইবন মুররা ইবন কা'ব ইবন লুআই ইবুন গালিব ইব্‌ন ফিহর। উম্মে হাবীরের মাতার নাম বাররা বিত আওফ ইবন উবায়দ ইবন উয়াইজ ইবন আদী ইবন কা'ব ইবুন লুআই ইবন গালিব ইবন ফিহর।

বিয়ে সম্পন্ন হবার পর আমিনার সাথে উপরোক্ত রুকাইয়া বিনতে নাওফলের কথােপকথন কথিত আছে যে, আবদুল্লাহ আমিনার নিকট নিজের স্থাবর সম্পত্তির মালিকানা হস্তান্তরের পরই তার সাথে মিলিত হন এবং প্রথম মিলনেই রাসূল (সা) আমিনার গর্ভে আসেন। 


তারপর আবদুল্লাহ্ বাইরে যান এবং রুকাইয়া বিন্‌ত নাওফলের সাথে সাক্ষাত করে দেখেন, তার মধ্যে আর আগের মনােলাব নেই। আবদুল্লাহ্ বলেন : “ব্যাপার কি, এখন যে তুমি আমাকে গতকালকের মত প্রস্তাব দিচ্ছ না?"

 রুকাইয়া বলল : “এখন আর তােমাকে দিয়ে আমার প্রয়ােজন নেই। কাল তােমার ভেতরে যে জ্যোতি ছিল, আজ তা নেই।" রুকাইয়া স্বীয় ভাই ওয়ারাকার নিকট শুনেছিল যে, এই জাতির মধ্যে একজন নবীর আগমন আসন্ন। 

ওয়ারাকা খ্রিষ্টান ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন এবং ঐশী গ্রন্থে পারদর্শী ছিলেন। ইবন ইসহাক বলেন : আবু ইসহাক ইবন ইয়াসারের কাছ থেকে আমি লােকমুখে শুনেছি যে, আমিনা বিন্‌তে ওয়াহবের পাশাপাশি আর একজন স্ত্রীও আবদুল্লাহ্র ছিল এবং তিনি সেই স্ত্রীর কাছেই প্রথম মিলিত হতে গিয়েছিলেন।


 কিন্তু সেদিন তিনি কাদামাটি সংক্রান্ত কাজ করায় ভার গায়ে কিছু কাদামাটি লেগেছিল। তাই ঐ স্ত্রী তাঁর ডাকে তুরিত সাড়া দিতে ব্যর্থ হয়। একে আবদুল্লাহ উযু ও গােসল করে পরিচ্ছন্ন হয়ে আসেন এবং এবার আমিনার কাছে যান। 

এ সময় পূর্বোক্ত স্ত্রী তাকে ডাকলেও তিনি তার ডাক উপেক্ষা করেন এবং আমিনার সাথে মিলিত হন। সেই মিলনের ফলে মুহাম্মদ (সা) গর্ভে আসেন। তারপর পূর্বোক্ত স্ত্রীর কাছে গেলে সে মিলিত হতে অসন্মতি জানায় এবং বলে ; ইতিপূর্বে যখন তুমি আমার কাছ দিয়ে যাচ্ছিলে, তখন তােমার দুই চোখের মাথানে একটা উজ্জ্বল জ্যোতি ঝিকমিক করছিল। 

কিন্তু আমিনার সাথে মিলিত হবার পর তোমার কপালে সেই জ্যোতি আর নেই। ইবুন ইসহাক-এর মধ্যে এই মহিলা আবদুল্লাহর কপালে ঘােড়ার কপালের সাদা চিহ্নের মত একটা সাদা চিহ্ন দেখেছিল, যা আমিনার সাথে মিলিত হবার পর অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল ।

যাহােক, শেষ পর্যন্ত আমিনার গর্ভেই পিতামাতা উভয় দিকের বংশীয় আভিজাত্য ও গৌরব নিয়ে রাসূল (সা) জন্মগ্রহণ করেছিলেন।


রাসূল (সা)-এর আম্মাজান আমিনা বিনত ওয়াহব বলতেন: রাসূল (সা)-কে গর্ভে আসার পর আমি বিভিন্ন ধরনের  স্বপ্ন দেখতে শুরু  করি। একবার স্বপ্ন আমাকে কে যেন বলল ; মানবজাতির মহানায়ককে গর্ভে ধারণ করেছ। 

তিনি যখন ভূমিষ্ঠ হবেন, তখন তুমি বলৰে ; আমি আমার এই সন্তানকে সকল হিংসুকের অনিষ্ট থেকে এক আল্লাহর আশ্রয়ে সমর্পণ করছি। 

তারপর তার নাম রেখাে মুহাম্মদ ? তিনি গর্ভে থাকাকালে আমি আরাে স্বপ্ন দেখেন যে, তার দেহের ভেতর থেকে এমন একটা আলোকরশ্মি বের হলো, যার জন্য তিনি সিরীয় ভূখণ্ডের বুসরার প্রাসাদসমূহ পর্যন্ত দেখতে পেলেন।

আবদুল্লাহ তিরােধান তিনি মাতৃগর্ভে থাকতেই তার পিতা আবদুল্লাহ ইন্তিকাল করেন।


হযরত খাব্বাব (রাঃ)এর ইসলামের জন্য কষ্ট সহ্য করা

 হযরত খাব্বাব (রাঃ)এর ইসলামের জন্য কষ্ট সহ্য করা




শাবী (রহঃ) বলেন, হযরত খাব্বাব ইবনে আরাত্ব (রাঃ) হযরত ওমর ইবনে খাত্তাব (রাঃ)এর নিকট গেলেন। হযরত ওমর (রাঃ) তাকে নিজের  আসনে বসিতে দিয়া বলিলেন, জমিনের উপর  এমন এক ব্যক্তিই  আছেন যিনি তােমার চেয়ে বেশী এই আসনে বসার হক রাখেন।

 হযরত খাব্বাব (রাঃ) জিজ্ঞাসা করিলেন, আমীরুল মুমিনীন, কে সেই ব্যক্তি? হযরত ওমর (রাঃ) বলিলেন, হযরত বেলাল (রাঃ)। হযরত খাব্বাব (রাঃ) বলিলেন, না, তিনি আমার চেয়ে  বেশী হক রাখেন না। 


কারণ মুশরিকদের মধ্যে হযরত বেলাল (রাঃ)এর পক্ষে এমন লােকও ছিল যাহার দ্বারা আল্লাহ তায়ালা তাহাকে রক্ষা করিতেন। কিন্তু আমার পক্ষে তাহাদের মধ্যে এমন কেহ ছিল না যাহার দ্বারা আল্লাহ তায়ালা আমাকে রক্ষা করিবেন।

 একদিন মুশরিকগণ আমাকে আগুন জ্বালাইয়া  উহার উপর রাখল এবং কেউ একজন পা আমার বুকের উপর  রাখিল। আমার নিজের পিঠ ব্যতীত সেই উত্তপ্ত যমীন হইতে নিজেকে রক্ষা করিবার আর কোন উপায় ছিল না। 

বর্ণনাকারী বলেন, এরপর হযরত খাব্বাব (রাঃ) নিজের পিঠের কাপড় সরাইয়া দেখাইলেন।  পিঠ আগুনে পুড়িয়া  সাদা হইয়া গিয়াছে। (কানযুল উম্মাল)


শাবী (রহঃ) বলেন, হযরত ওমর (রাঃ) হযরত বেলাল (রাঃ)কে তাঁহার প্রতি মুশরিকদের নির্যাতন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করিলে হযরত খাব্বাব (রাঃ) বলিলেন, আমীরুল মুমিনীন, আমার পিঠের অবস্থা দেখুন।

হযরত ওমর (রাঃ) (তাহার পিঠ দেখিয়া) বলিলেন, আমি এইরূপ পিঠ কখনও দেখি নাই। হযরত খাব্বাব (রাঃ) বলিলেন, মুশরিকগণ আগুন জ্বালাইয়া আমাকে উহার উপর শােয়াইয়া দিয়াছিল। আমার পিঠের চর্বি গলিয়া সেই আগুন নিভিয়াছে। 

অপর এক রেওয়ায়াতে আছে, হযরত ওমর (রাঃ)এর নিকট  হযরত খাব্বাব (রাঃ) আসিলে তিনি বলিলেন, নিকটে আস, হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসির (রাঃ) ব্যতীত আর কেহ তােমার অপেক্ষা অধিক এই আসনে বসিবার অধিকার রাখে না।


 হযরত খাব্বাব (রাঃ) তাঁহাকে নিজের পিঠের উপর মুশরিকদের অত্যাচারের চিহ্ন দেখাইতে লাগিলেন। অপর এক রেওয়ায়াতে আছে, হযরত খাব্বাব (রাঃ) বলেন, আমি ছিলাম একজন কর্মকার । 

আস ইবনে ওয়ায়েলের কাছে আমার কিছু পাওনা পরিশোধের জন্য বললাম। সে বলিল, না, খােদার কসম, যতক্ষণ না তুমি মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)কে অস্বীকার করিবে ততক্ষণ আমি তােমার পাওনা আদায় করিব না। 

আমি বলিলাম, না, আল্লাহর কসম, তুমি মরিয়া পুনরায় জীবিত হইবে তবুও আমি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অস্বীকার করিব না। সে বলিল, আমি মরিয়া পুনরায় জীবিত হইলে তখন তুমি আমার নিকট আসিও। 


সেখানেও আমার মাল-আওলাদ হইবে, আমি তােমার পাওনা দিয়া দিব। আল্লাহ তায়ালা তাহার এই কথার জবাবে কোরআনের আয়াত নাযিল করিলেন,

অর্থ ঃ আপনি কি তাহাকে লক্ষ্য করিয়াছেন, যে আমার নিদর্শনাবলীকে অবিশ্বাস করে এবং বলে, আমাকে অর্থ-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি অবশ্যই দেওয়া হইবে।

 সে কি অদৃশ্য বিষয় জানিয়া ফেলিয়াছে, অথবা দয়াময় আল্লাহর নিকট হইতে কোন প্রতিশ্রুতি প্রাপ্ত হইয়াছে? না, এরূপ কখনও নহে। সে যাহা বলে আমি তাহা লিখিয়া রাখিব এবং তাহার শাস্তি দীর্ঘায়িত করিতে থাকিব। 

সে যাহা বলে মৃত্যুর পর আমি তাহা লইয়া লইব এবং সে আমার নিকট আসিবে একাকী।

অপর এক রেওয়ায়াতে আছে, হযরত খাব্বাব (রাঃ) বলিয়াছেন যে, আমি একবার নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে দেখলাম। তিনি চাদরে হেলান দিয়া কাবা শরীফের ছায়ায় বসিয়াছিলেন। 

সেই সময় আমরা মুশরিকদের পক্ষ হইতে নিদারুন কষ্ট সহ্য করিতেছিলাম। আমি বলিলাম, আপনি আল্লাহর নিকট দোয়া কেন করিতেছেন না? নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (ইহা শুনিতেই) সােজা হইয়া বসিলেন এবং তাঁহার চেহারা মুবারক রক্তিম হইয়া উঠিল।

 তিনি বলিলেন, তােমাদের পূর্ববর্তীদের মধ্যে এমন লােকও ছিল যে, লােহার চিরুনী দ্বারা তাহার হাড় হইতে গােশত খুলিয়া লওয়া হইত কিন্তু তাহাকে দ্বীন হইতে সরাইতে পারিত না। 


আল্লাহ তায়ালা অবশ্যই এই দ্বীনকে পরিপূর্ণতা দান করিবেন। তােমরা দেখিতে পাইবে যে, সানআ হইতে একজন আরােহী হাজারা মাউত পর্যন্ত সফর করিবে।

তাহার অন্তরে আল্লাহ ব্যতীত আর কাহারাে ভয় থাকিবে না এবং তাহার বকরির পালের উপর বাঘের ভয় ব্যতীত আর কোন ভয় থাকিবে না, কিন্তু তােমরা তাড়াহুড়া করিতেছ।

হযরত বেলাল (রাঃ)এর ইসলামের জন্য কষ্ট সহ্য করা

হযরত বেলাল (রাঃ)এর ইসলামের জন্য  কষ্ট সহ্য করা



হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন, সর্বপ্রথম যাহারা ইসলামকে প্রকাশ করিয়াছেন তাঁহারা সাতজন ছিলেন--রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, হযরত আবু বকর (রাঃ), হযরত আম্মার ও তাঁহার মা সুমাইয়া (রঃ), হযরত সুহাইব (রাঃ), হযরত বেলাল (রাঃ) ও মেকদাদ (রাঃ)।

 রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আল্লাহ তায়ালা তাঁহার চাচার দ্বারা এবং হযরত আবু বকর (রাঃ)কে তাহার কাওমের দ্বারা হেফাজত করিয়াছেন। 

অন্যসকলকে কাফেরগণ ধরিয়াএইভাবে শাস্তি প্রদান করিয়াছে যে, লৌহবর্ম পরিধান করাইয়া তাহাদিগকে রৌদ্রে দাঁড় করাইয়া দিত এবং প্রখর রৌদ্রে সেই লৌহবর্ম উত্তপ্ত হইয়া তাহাদের কষ্ট হইত। 


হযরত বেলাল (রাঃ) ব্যতীত তাহাদের প্রত্যেকেই (এই ধরনের অত্যাচার ও উৎপীড়নে বাধ্য হইয়া বাহ্যিকভাবে) কাফেরদের কথাকে স্বীকার করিয়াছে। 

কিন্তু হযরত বেলাল (রাঃ) আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে নিজের প্রাণের কোন পরওয়া করেন নাই এবং তাহার কাওমের নিকটও তাহার কোন মর্যাদা ছিল না। এই কারণেই মুশরিকগণ তাহাকে ধরিয়া বালকদের হাতে দিয়া দিল।

 বালকরা তাহাকে মক্কার অলিগলিতে টানিয়া ফিরিত আর তিনি আহাদ, আহাদ (অর্থাৎ আল্লাহ এক আল্লাহ এক) বলিতে থাকিতেন। (বিদায়াহ)


মুজাহিদ (রহঃ) হইতে বর্ণিত রেওয়ায়াতে আছে যে, অন্যান্যদেরকে কাফেরগণ লৌহবর্ম পরিধান করাইয়া রৌদ্রে উত্তপ্ত করিত। এইভাবে আল্লাহর ইচ্ছায় লােহার গরমে ও রৌদ্রের তাপে তাহাদের সীমাহীন কষ্ট হইত।

 অতঃপর সন্ধ্যার সময় মালাউন আবু জেহেল বর্শা হাতে আসিয়া তাহাদিগকে গালাগাল করিত এবং ধমকাইত। অপর এক রেওয়ায়াতে আছে যে, মুশরিকগণ হযরত বেলাল (রাঃ)এর গলায় রশি বাঁধিয়া মক্কার দুই আখশাবাইন পাহাড়ের মাঝে টানিয়া বেড়াইত। (ইবনে সা'দ)

হযরত ওরওয়া ইবনে যুবাইর (রাঃ) বলেন, হযরত বেলাল (রাঃ) বনু জুমাহ গােত্রীয় এক মহিলার গােলাম ছিলেন। মুশরিকগণ তাহাকে মক্কার উত্তপ্ত বালুর উপর শােয়াইয়া শাস্তি দিত এবং বুকের উপর ভারি পাথর চাপা দিয়া) উত্তপ্ত বালুর সহিত তাহার পৃষ্ঠদেশকে লাগাইয়া দিত যেন (অতিষ্ঠ হইয়া) মুশরিক হইয়া যায়।


 কিন্তু তিনি আহাদ, আহাদ উচ্চারণ করিতে থাকিতেন। (হযরত খাদীজা (রাঃ)এর চাচাত ভাই) অরাকা (ইবনে নাওফাল) এই অবস্থায় তাঁহার পাশ দিয়া যাওয়ার সময় বলিতেন, হে বেলাল, আহাদ, আহাদ অর্থাৎ হাঁ, মাবুদ একজনই)।

 (অতঃপর মুশরিকদের উদ্দেশ্যে বলিতেন) আল্লাহর কসম, তােমরা যদি এই অবস্থায় তাহাকে হত্যা কর তবে আমি তাহার কবরকে রহমত ও বরকতের স্থান বানাইয়া লইব। (এসাবাহ)

ওরওয়া (রাঃ) বলেন, হযরত বেলাল (রাঃ)কে যখন  কষ্ট দেওয়া তখন তিনি আহাদ, আহাদ বলিতেছেন। এটা দেখে  অরাকা ইবনে নাওফাল তাহার পাশ দিয়া যাইতেন আর বলিতেন, হে বেলাল, আহাদ, আহাদ (অর্থাৎ মা'বুদ একজনই)! 


আল্লাহই সেই মাবুদ। অতঃপর উমাইয়া ইবনে খালাফ যে হযরত বেলাল (রাঃ)এর সহিত এইরূপ ব্যবহার করিতেছিল তাহাকে উদ্দেশ্য করিয়া বলিলেন, আমি আল্লাহর নামে কসম করিয়া বলিতেছি যে, যদি তােমরা তাহাকে এইভাবে হত্যা কর।

তবে আমি তাহার কবরকে রহমত ও বরকতের স্থান বানাইয়া লইব। অবশেষে একদিন তাহারা এ রূপ নির্যতন চালাইতেছিল এমন সময় হযরত আবু বকর (রাঃ) হযরত বেলাল (রাঃ)এর পাশ দিয়া যাওয়ার সময় উমাইয়াকে বলিলেন, এই অসহায়ের ব্যাপারে কি তুমি আল্লাহকে ভয় কর না?

 কতদিন এইভাবে তাহার উপর নির্যাতন চালাইবে)? উমাইয়া বলিল, তুমিই তাে তাহাকে নষ্ট করিয়াছ। তুমিই তাহাকে এই শাস্তি হইতে মুক্ত কর। হযরত আবু বকর (রাঃ) বলিলেন, আমি তাহাকে মুক্ত করিব। 


আমার নিকট তােমার ধর্মেবিশ্বাসী এবং শক্তিশালী ও মজবুত একজন হাবশী গােলাম রহিয়াছে। আমি তাহাকে বেলালের পরিবর্তে তােমাকে দিয়া দিলাম। উমাইয়া বলিল, আমি তাহা গ্রহণ করিলাম।

 হযরত আবু বকর (রাঃ) উক্ত গােলাম তাহাকে দিয়া দিলেন এবং হযরত বেলাল (রাঃ)কে লইয়া স্বাধীন করিয়া দিলেন। তারপর মক্কা হইতে হিজরতের পূর্বে হযরত আবু বকর (রাঃ) আরাে ছয়জনকে মুক্ত করিয়া স্বাধীন করিলেন।

 হযরত বেলাল (রাঃ) তন্মধ্যে সপ্তম ছিলেন। ইবনে ইসহাক (রাঃ) হতে বর্ণিত অপর এক রেওয়ায়াতে আছে যে, উমাইয়া হযরত বেলাল (রাঃ)কে উত্তপ্ত রৌদ্রের মধ্যে বাহির করিয়া আনিত এবং মক্কার প্রস্তরময় যমীনের উপর তাহাকে চিৎ করিয়া ফেলিত। 


অতঃপর একটি বড় পাথর তাহার বুকের উপর চাপাইয়া দিবার নির্দেশ দিত। নির্দেশ মত তাহার বুকের উপর ভারি পাথর রাখা হইত। 

এমতাবস্থায় উমাইয়া বলিত, তুমি এইভাবে মরিয়া যাইবে আর না হয় মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অস্বীকার করিবে এবং, লা—ত ও যার পূজা করিবে। 

হযরত বেলাল (রাঃ) এই কষ্টের মধ্যেও বলিতেন, আহাদ, আহাদ। হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসির (রাঃ) হযরত বেলাল (রাঃ) ও তাহার সঙ্গীদের দুঃখকষ্ট সহ্য করার এবং হযরত আবু বকর (রাঃ) কর্তৃক তাহাকে মুক্ত করিয়া দেওয়ার ঘটনা স্মরণ করিয়া নিম্নের কবিতাটি আবৃত্তি করিয়াছেন।


 হযরত আবু বকর (রাঃ) এর নাম আতীক (অর্থাৎ দোযখ হইতে মুক্ত) ছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাহাকে এই উপাধি দিয়াছিলেন অথবা তাঁহার মা তাঁহার এই নাম রাখিয়াছিলেন।


হযরত আম্মার (রাঃ)এর কবিতা নিম্নরূপ-

অর্থঃ (১) হযরত বেলাল (রাঃ) ও তাঁহার সঙ্গীদের পক্ষ হইতে আল্লাহ তায়ালা আতীক (অর্থাৎ হযরত আবু বকরকে উত্তম পুরস্কার দান করুন এবং (আবু জেহেলের চাচা) ফাকেহ (ইবনে মুগীরা) ও আবু জেহেলকে অপমানিত করুন। 

(২) আমি সেই বিকালের কথা ভুলিব না যখন তাহারা উভয়ে হযরত বেলাল (রাঃ)কে নির্যাতন করিবার ইচ্ছা করিয়াছিল এবং তাহারা এরূপ নির্যাতন করিতে কোন ভয় করিতেছিল যাহা করিতে প্রত্যেক বিবেকবান ব্যক্তি ভয় করিয়া থাকে।

 (৩) এই অমানুষিক নির্যাতনের কারণ এই ছিল যে, হযরত বেলাল (রাঃ) সমগ্র সৃষ্টির প্রতিপালকের একত্ববাদকে স্বীকার করিয়াছিলেন এবং বলিয়াছিলেন যে, আমি সাক্ষ্য দিতেছি, আমার প্রতিপালক একমাত্র আল্লাহ, একটু তাে থাম!

 (৪) তাহারা আমাকে হত্যা করিতে চাহে করুক, আমি হত্যার ভয়ে রাহমানের সহিত শিরিক করিব না। 

(৫) হে ইবরাহীম, ইউনুস, মূসা ও ঈসা (আঃ) এর প্রতিপালক আমাকে মুক্তি দান করুন, আর কখনও আমাকে গালিবের পরিবারস্থ ঐ সকল লােকের দ্বারা পরীক্ষায় ফেলিবেন না যাহারা পথভ্রষ্ট হইতে চায় এবং অসৎ ও ইনসাফ করে না।

হযরত আলী (রাঃ) এর বর্মের ঘটনা ও একজন খৃষ্টানের ইসলাম গ্রহণ

 হযরত আলী (রাঃ) এর বর্মের ঘটনা ও একজন খৃষ্টানের ইসলাম গ্রহণ




শাবী (রহঃ) বলেন, একবার হযরত আলী (রাঃ) বাজারে গিয়ে দেখলেন, এক খৃষ্টান লোক  একটি বর্ম বিক্রয় করার জন্য বসে আছে  । হযরত আলী (রাঃ)  বর্মটি দেখে  বলিলেন, এটা আমার ।

 চলো কাজীর নিকটে সেই  আমাদের উভয়ের মধ্যে  ফয়সালা করিবেন। সে সময় মুসলমানদের কাৰ্জী ছিলেন হযরত শুরাইহ (রহঃ)। হযরত আলী (রাঃ)ই তাহাকে কাজী নিযুক্ত করিয়াছিলেন। 

কাজী শুরাইহ (রহঃ) আমীরুল মুমিনীনকে দেখিয়া আপন বিচার আসন হইতে উঠিয়া দাঁড়াইলেন এবং হযরত আলী (রাঃ)কে উক্ত আসনে বসাইয়া নিজে তাঁহার সম্মুখে খৃষ্টানের পাশে বসিলেন। 

হযরত আলী (রাঃ) বলিলেন, হে শুরাইহ, আমার বিবাদী যদি মুসলমান হইত তবে আমি তাহার সহিত বসিতাম। কিন্তু আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলিতে শুনিয়াছি যে, 

এই সকল (অমুসলিম যিম্মী)দের সহিত মুসাফাহা করিও না, তাহাদিগকে প্রথমে সালাম দিও না, তাহাদের রুগীদের শুশ্রুষা করিও, তাহাদের জানাযার নামায পড়িও না এবং তাহাদিগকে পথের সংকীর্ণ অংশে চলিতে বাধ্য করিবে। 


আল্লাহ পাক তাহাদিগকে যেরূপ হীন ও নিকৃষ্ট করিয়া রাখিয়াছেন তােমরাও তাহাদিগকে সেরূপ হীন ও নিকৃষ্ট করিয়া রাখিবে।' হে শুরাইহ, আমার ও এই ব্যক্তির মধ্যে ফয়সালা করিয়া দাও।

শুরাইহ (রহঃ) বলিলেন, হে আমীরুল মুমিনীন, আপনার দাবী কি ? হযরত আলী (রাঃ) বলিলেন, এই বর্ম আমার। দীর্ঘদিন হয় উহা আমার নিকট হইতে হারাইয়া গিয়াছে। শুরাইহ (রহঃ) বলিলেন, হে খৃষ্টান, তােমার কি বক্তব্য ? 

সে বলিল, আমি বলি না যে, আমীরুল মুমিনীন ভুল বলিতেছেন, তবে বর্মটি আমারই। শুরাইহ (রহঃ) বলিলেন, আমার ফয়সালা এই যে, যেহেতু আপনার নিকট কোন প্রমাণ নাই সেহেতু এই বর্ম তাহার নিকট হইতে লওয়া যাইবে না।

 হযরত আলী (রাঃ) বলিলেন, কাজী শুরাইহ ঠিক ফয়সালা করিয়াছে। ইহা শুনিয়া খৃষ্টান বলিল, আমি সাক্ষ্য দিতেছি যে, ইহা নবীদের ফয়সালার অনুরূপ। আমীরুল মুমিনীন আপন অধীনস্থ কাজীর নিকট স্বয়ং আসিয়াছেন এবং কাজী তাঁহার বিপক্ষে ফয়সালা করিয়াছেন।


খােদার কসম, হে আমীরুল মুমিনীন, এই বর্ম আপনার। একদিন আমি আপনার পিছনে পথ চলিতেছিলাম। তখন আপনার  উটের উপর থেকে এটা পড়ে  গেলে আমি সেটা  নিয়ে গিয়েছিলাম । আমি সাক্ষ্য দিতেছি যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন মা'বুদ নাই এবং হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) আল্লাহর রাসূল।

হযরত আলী (রাঃ) বলিলেন, তুমি যখন ইসলাম গ্রহণ করিয়াছ, তখন এই বর্ম তােমার এবং তাহাকে একটি ঘােড়াও দান করিলেন। হাকেম হইতে বর্ণিত এক রেওয়ায়াতে আছে যে, জঙ্গে জুমলের দিন হযরত আলী (রাঃ)এর একটি বর্ম হারাইয়া গিয়াছিল। 

এক ব্যক্তি পাইয়া অপর এক ব্যক্তির নিকট বিক্রয় করিয়াছিল। হযরত আলী (রাঃ) এক ইহুদীর নিকট সেই বৰ্ম দেখিয়া চিনিতে পারিলেন এবং উক্ত ইহুদীর বিরুদ্ধে কাজী শুরাইহের আদালতে মামলা দায়ের করিলেন। 


হযরত আলী (রাঃ)এর পক্ষে তাহার পুত্র হযরত হাসান (রাঃ) ও কাম্বার নামীয় হযরত আলী (রাঃ)এর আযাদ করা গােলাম সাক্ষ্য দিলেন। কাজী শুরাইহ বলিলেন, হযরত হাসান (রাঃ)এর স্থলে অন্য কোন সাক্ষী হাজির করুন।।

হযরত আলী (রাঃ) বলিলেন, আপনি কি হাসানের সাক্ষ্য গ্রহণ করিবেন না? কাজী শুরাইহ বলিলেন, না। কারণ আপনার মুখেই এই কথা শুনিয়াছি যে, পিতার পক্ষে পুত্রের সাক্ষ্য দুরস্ত নাই।

ইয়াযীদ তাইমী (রহঃ) হইতে উক্ত হাদীস বিস্তারিতভাবে এইরূপ বর্ণিত হইয়াছে যে, কাজী শুরাইহ (রহঃ) বলিলেন, আপনার গােলামের সাক্ষ্য তাে আমরা গ্রহণ করিলাম, কিন্তু আপনার পক্ষে আপনার পুত্রের সাক্ষ্য গ্রহণ করিতে পারি না। 

হযরত আলী (রাঃ) বলিলেন, তােমার মা তােমাকে হারাক, তুমি কি হযরত ওমর (রাঃ)কে বলিতে শুন নাই যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলিয়াছেন, হাসান-হােসাইন বেহেশতে যুবকদের দুই সর্দার। 


অতঃপর ইহুদীকে বলিলেন, এই বর্ম তুমি লইয়া যাও। ইহুদী (আশ্চর্য হইয়া) বলিল, ‘আমীরুল মুমিনীন আমার সহিত মুসলমানদের কাজীর আদালতে হাজির হইয়াছেন, আর কাজী তাঁহার বিপক্ষে ফয়সালা করিবার পর তিনি তাহা মানিয়া লইলেন !

খােদার কসম, হে আমীরুল মুমিনীন, আপনি সত্য বলিয়াছেন, ইহা আপনারই বর্ম। আপনার উটের পিঠ হইতে উহা পড়িয়া গেলে আমি তুলিয়া লইয়াছিলাম। 


আমি সাক্ষ্য দিতেছি যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন মা'বুদ নাই এবং হযরত মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আল্লাহর রাসূল।

 হযরত আলী (রাঃ) তাহাকে বর্মটি দান করিলেন এবং অতিরিক্ত সাতশত দেরহাম দিলেন। অতঃপর সে ব্যক্তি মুসলমান হইবার পর হইতে হযরত আলী (রাঃ)এর সঙ্গে থাকিতে লাগিল এবং সিফফীনের যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করিল। (কানযুল উম্মাল)





বীরে মাউনার যুদ্ধে ৭০ জন সাহাবীর শহীদ হওয়ার হৃদয় বিদারক ঘটনা

বীরে মাউনার যুদ্ধে ৭০ জন সাহাবীর শহীদ হওয়ার হৃদয় বিদারক ঘটনা 



হযরত মুগীরা ইবনে আবদুর রহমান (রাঃ) ও হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আবি বকর ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে আমর ইবনে হাযম (রাঃ) বলেন,  আবু বর আমের ইবনে মালেক ইবনে জা'ফর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে মদীনায় আসিল।

 রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাহার কাছে  ইসলামের দাওয়াত পেশ করলেন । সে দাওয়াত  কবুল  করিল না এবং দাওয়াত  কবুলে অনিচ্ছাও প্রকাশ করিল না। 

সে বলিল, হে মুহাম্মাদ, আপনি  নাজাসীদের নিকট যদি সাহাবাদের পাঠাইয়া দেন, আর তারা যদি  তাহাদিগকে দাওয়াত দেয় তবে আমি আশা করি তাহারা আপনার দ্বীন মানিয়া লইবে।


রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলিলেন, নাজদবাসীদের পক্ষ হইতে আমি আমার সাহাবাদের ব্যাপারে আশঙ্কা বােধ করি। আবু বার বলিল, আমি তাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব  নিলাম।

 অতএব আপনি তাহাদিগকে প্রেরণ করুন যাহাতে তাহারা তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিতে পারে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বনু সায়েদাহ গোত্রের মুনযির ইবনে আমর সহ সত্তরজন সাহাবাকে প্রেরণ করিলেন ।


যাহাদের মধ্যে হযরত হারেস ইবনে সিম্মাহ, বনু আদী ইবনে নাজ্জার গােত্রের হযরত হারাম ইবনে মিলহান, হযরত ওরওয়া ইবনে আসমা ইবনে সাত সুলামী, হযরত নাফে ইবনে বুদাইল ইবনে ওয়ারকা খুযাই, হযরত আবু বকর (রাঃ) এর গােলাম হযরত আমর ইবনে ফুহাইরাহ (রাঃ) ও আরাে অন্যান্য বিশিষ্ট মুসলমানগণও ছিলেন।

 তাহারা মদীনা হইতে রওয়ানা হইয়া বীরে মাউনা নামক স্থানে পৌছিলেন। ইহা বনু আমেরের এলাকা ও বনূ সুলাইমের প্রস্তরময় ময়দানের মধ্যবর্তী একটি কুয়ার নাম।

 সেখানে পৌঁছে তারা,  রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চিঠি দিয়া হযরত হাম ইবনে মিলহান (রাঃ) কে আমের ইবনে তােফায়েলের কাছে পাঠাইলেন। 

হযরত হারাম (রাঃ) আমেরের নিকট পৌঁছিলে সে চিঠির প্রতি ক্ষেপই করিল না, বরং হযরত হারাম (রাঃ) এর উপর আক্রমণ করিল এবং তাহাকে শহীদ করিয়া দিল। তারপর সে সাহাবা (রাঃ)দের বিরুদ্ধে আপন গােত্র) বন্ আমেরের নিকট সাহায্য চাহিল।


 কিন্তু বনূ আমের তাহার ডাকে সাড়া দিতে অস্বীকার করিল এবং তাহারা বলিল, আবু বার যেহেতু এদেরকে নিরাপত্তা দিয়াছে এবং তাদের সহিত অঙ্গীকার বদ্ধ হইয়াছে তাই  আমরা তাহার ওয়াদা ভঙ্গ করিতে পারি না।

অতঃপর আমের সাহাবাদের বিরুদ্ধে বন্ সুলাইম, উসাইয়াহ, রেল ও যাকওয়ান গােত্রসমূহের নিকট সাহায্য চাহিল। তাহারা এই কাজে সাড়া দিল। সুতরাং এই সমস্ত গোত্ৰসমূহ এক জোট হইয়া আসিল এবং মুসলমানদের অবস্থানস্থলকে চারিদিক হইতে ঘিরিয়া ফেলিল।

মুসলমানগণ গােত্রসমূহকে দেখিয়া নিজেদের তলোয়ার ধারণ করিলেন এবং  যুদ্ধ শুরু  করিলেন। এবং  সবাই শহীদ হইয়া গেলেন। একমাত্র বনু দীনায় ইবনে নাজ্জারের হযরত কা'ব ইবনে যায়েদ (রাঃ) জীবিত রহিলেন। 


কাফেরেরা  মৃত  মনে করে চলে যায়। পরে তাহাকে  উঠাইয়া আনা হয় এবং পরে  তিনি বাঁচিয়া যান। পরবর্তীতে খন্দকের যুদ্ধে তিনি শাহাদাত বরণ করেন। 

হযরত আমর ইবনে উমাইয়া যামরী (রাঃ) ও বনু আমর ইবনে আওফ গােত্রের একজন আনসারী সাহাবী (রাঃ) এই দুইজন মুসলমানদের পশু চরাইবার জন্য গিয়াছিলেন। 

তাহারা মুসলমানদের অবস্থানস্থলে (মৃতভােজী) পাখী উড়িতে দেখিয়া মুসলমানদের আক্রান্ত হওয়ার কথা বুঝিতে পারিলেন। সুতরাং তাহারা বলিলেন, আল্লাহর কসম, এই পাখীগুলো  উড়ার পিছনে অবশ্যই  কোন   কারণ রহিয়াছে। 

তারা দুজনেই  দেখার জন্য রওনা  হইলেন এবং আসিয়া দেখিলেন, সবাই মুসলমান রক্তাক্ত অবস্থায় পড়িয়া আছেন এবং যে সকল ঘােড়সওয়াররা তাদেরকে কতল করিয়াছে তারা সেখানে দাড়িয়ে রয়েছে। 


এই দৃশ্য  দেখে  হযরত আমর ইবনে উমাইয়া (রাঃ) কে বলিলেন, তােমার কি রায়? হযরত আমর (রাঃ) বলিলেন, আমার রায় হল,  রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে আমরা  এই ঘটনার জানাই । 

আনসারী সাহাবি বলিলেন, আমি আমার জন্য  এই জায়গা ছাড়িতে পারি না যেখানে হযরত মুনযির ইবনে আমর (রাঃ) কে শহীদ করিয়া দেওয়া হইয়াছে। 

আর আমি জীবিত থেকে তার  শহীদ হওয়ার কথা শুনিতে চাই না। এই কথা বলিয়া তিনি কাফেরদের সাথে যুদ্ধ শুরু  করলেন এবং শহীদ হইয়া গেলেন। 

কাফেররা হযরত আমর ইবনে উমাইয়া (রাঃ)কে বন্দী করিল। তিনি যখন তাহাদের নিকট নিজেকে মুদার গােত্রীয় বলিয়া প্রকাশ করিলেন তখন আমের ইবনে তােফায়েল তাহাকে মুক্ত করিয়া দিল।(বিদায়াহ)


 নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম  হযরত হারাম (রাঃ)কে সত্তরজন আরােহীর এক জামাতের সহিত প্রেরণ করিলেন। (উক্ত এলাকার) মুশরিকদের সর্দার আমের ইবনে তােফায়েল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে  যে কোন একটি গ্রহণের জন্য বলিলেন।

 সে বলিয়াছিল যে, গ্রামের অধিবাসীগণ আপনার অধীন থাকিবে আর শহরের অধিবাসীগণ আমার অধীন থাকিবে, আর না হয় আপনার পর আমাকে আপনার খলীফা নিযুক্ত করিবেন। 

নতুবা আমি গাতফান গােত্রের হাজার হাজার সৈন্য লইয়া আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিব। আমের  এক মহিলার ঘরে ছিলেন যার নাম উম্মে ফুলান।


 এমতাবস্থায় সে প্লেগ রােগে আক্রান্ত হইল এবং বলিল, আমার প্লেগ রােগের ফোড়া হইয়াছে। (সফর অবস্থায় সাধারণ এক মহিলার ঘরে অসহায়ভাবে মৃত্যুবরণকে নিজের জন্য অপমানকর মনে করিয়া বলিল, ) আমার ঘোড়া আন।

 অতঃপর (ঘােড়ায় চড়িয়া রওয়ানা হইল এবং) ঘােড়ার পিঠেই তাহার মৃত্যু হইল। হযরত উম্মে সুলাইম (রাঃ)এর ভাই হযরত হারাম (রাঃ) ও একজন খোড়া সাহাবী ও অমুক গােত্রের এক ব্যক্তি ইহারা তিনজন চলিলেন।

হযরত হারাম (রাঃ) তাহার উভয় সঙ্গীকে বলিলেন, আমি তাহাদের নিকট যাইতেছি, আর তােমরা দুইজন নিকটবর্তী কোন স্থানে অবস্থান কর। 

যদি তাহারা আমাকে নিরাপত্তা দেয় তবে তােমরা তাে নিকটেই আছ, আর যদি তাহারা আমাকে কতল করিয়া দেয় তবে তােমরা আপন সঙ্গীদের নিকট চলিয়া যাইবে। 

অতঃপর হযরত হারাম (রাঃ) সেখানে যাইয়া লােকদেরকে বলিলেন, তােমরা কি আমাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পয়গাম পৌঁছাইবার জন্য নিরাপত্তা দিবে? তিনি তাহাদের সহিত কথাবার্তা বলিতেছিলেন। 

এর মধ্যে একজনকে তারা ইশারা করিল, আর সে পিছন দিক থেকে  তাকে বর্শা মারিল। এমতাবস্থায় হযরত হারাম (রাঃ) বলিয়া উঠিলেন, আল্লাহু আকবার, কা'বার রবের কসম, আমি সফলকাম হইয়াছি। 

ইহা দেখিয়া তাহার সঙ্গী মুসলমানদের সহিত যাইয়া মিলিত হইলেন। তারপর  খোড়া সাহাবী ছাড়া  সকল মুসলমানকে শহীদ করিয়া দেওয়া হইল।  


খোড়া সাহাবী পাহাড়ের উপর  ছিলেন। এই সকল শহীদদের ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা আমাদের উপর নিম্নোক্ত আয়াত নাযিল করিয়াছিলেন যাহা পরবর্তীতে মানসুখ বা রহিত করিয়া দেওয়া হইয়াছে।

অর্থ ঃ ও নিঃসন্দেহে আমরা আমাদের রবের সহিত মিলিত হইয়াছি, তিনি আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট হইয়াছেন এবং তিনি আমাদিগকে সন্তুষ্ট করিয়াছেন।

 নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জন্য ত্রিশদিন পর্যন্ত রেল, যাকওয়া, বনু লেহইয়ান ও উসাইয়াহ গােত্রসমূহের বিরুদ্ধে বদদোয়া করিয়াছেন, যাহারা আল্লাহ ও তাঁহার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নাফরমানী করিয়াছে।


বােখারীর রেওয়ায়াতে আছে, হযরত আনাস (রাঃ) বলেন, তাহার মামা হযরত হারাম ইবনে মিলহান (রাঃ)কে যখন বীরে মাউনার ঘটনার দিন বর্শা  মারা হইল তখন তিনি নিজের রক্ত লইয়া আপন মুখমণ্ডল ও মাথার উপর ছিটাইতে লাগিলেন। 

অতঃপর বলিলেন, কা'বার রবের কসম, আমি সফলকাম হইয়া গিয়াছি। ওয়াকেদী বর্ণনা করেন, যে ব্যক্তি তাকে  শহীদ করেছিল তাহার নাম হইল জাব্বার । 

জাব্বার (হযরত হারাম (রাঃ)এর কথা শুনিয়া) জিজ্ঞাসা করিল, 'আমি সফলকাম হইয়া গিয়াছি এই কথার কি অর্থ? লােকেরা তাহাকে বলিল, ইহা বেহেশত পাওয়ার সফলতা। 

অতঃপর জাব্বার বলিল, আল্লাহর কসম, সে সত্য বলিয়াছে। পরবর্তীতে জাবার এই কারণেই ইসলাম গ্রহণ করিলেন।(বিদায়াহ)

খন্দকের যুদ্ধের রাসূল (সাঃ) ও সাহাবিদের আশ্চর্যজনক ঘটনা

 খন্দকের যুদ্ধের রাসূল (সাঃ) ও সাহাবিদের  আশ্চর্যজনক ঘটনা 




হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খন্দক খনন করিতেছিলেন। তাঁহার সাহাবা (রাঃ) ক্ষুধার কারণে পেটে পাথর বাঁধিয়া রাখিয়াছিলেন। 

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাহাদের এই অবস্থা দেখিয়া বলিলেন, তােমাদের মতে এ মন লােক আছে কি যে, আমাদেরকে একবেলা খাওয়াইতে পারে? এক ব্যক্তি বলল, জ্বি হাঁ, আমার জানা আছে। 


রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলিলেন, যখন আর কোন উপায় নাই, তখন তুমিই অগ্রসর হও এবং আমাদেরকে লইয়া চল।

অতএব তাহারা সেই ব্যক্তির ঘরে গেলেন, কিন্তু ঘরের মালিক ঘরে ছিল না, সে তো নিজের অংশের খন্দক খননের কাজে ব্যস্ত ছিল। তাহার স্ত্রী সংবাদ পাঠাইল যে, তাড়াতাড়ি আস, কেননা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বয়ং আমাদের ঘরে আসিয়াছেন। 

সেই ব্যক্তি দৌড়াইয়া আসিল এবং বলিতে লাগিল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার পিতামাতা আপনার উপর কোরবান হউক । তাহার একটি বকরী ছিল এবং উহার একটি বাচ্চাও ছিল। সে (জবাই করার জন্য) দ্রুত বকরীর দিকে অগ্রসর হইল। 


রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলিলেন, বকরী জবাই করিলে উহার বাচ্চার কি উপায় হইবে? কাজেই বারী ওবাই করিও না। সুতরাং সে বকরীর বাচ্চা জবাই করিল এবং তাহার স্ত্রী সামান্য আটা লইয়া উহা শথিল এবং রুটি বানাইল।

ইতিমধ্যে গোশতের হাড়ি ও রান্না হইয়া গেল। তাহার স্ত্রী পেয়ালার মধ্যে রুটি ও গোশত দ্বারা সারীদ বানাইয়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁহার সাহাবা (রাঃ)দের সম্মুখে পেশ করিল।

 রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উহাতে আঙ্গুল রাখিয়া বলিলেন, বিসমিল্লাহ, আয় আল্লাহ : ইহাতে বরকত দান করুন। তারপর সাহাবা (রাঃ) দেরকে বলিলেন,) খাও। 

সাহাবা (রাঃ) উহা হইতে পেট ভরিয়া খাইলেন, কিন্তু তাহারা উহা হইতে মাত্র তিন ভাগের একভাগ খাইতে পারিলেন, আরাে দুই ভাগ অবশিষ্ট রহিয়া গেল।


রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সহিত যে দশজন সাহাবা ছিলেন তিনি তাহাদেরকে বলিলেন, যাও, তােমাদের ন্যায় আরাে দশজনকে পাঠাইয়া দাও । সুতরাং তাহারা চলিয়া গেলেন এবং অপর দশজনকে আসিলেন। 

তাহারাও অত্যন্ত পরিতৃপ্ত হইয়া খাইলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং ঘরের উক্ত মহিলা ও তাহার ঘরের সকলের জন্য বরকতের দোয়া করিলেন। তারপর তাহারা সকলে খন্দকের দিকে চলিলেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলিলেন, আমাদেরকে সালমানের নিকট লইয়া চল। সেখানে পৌছিয়া দেখিলেন, হযরত সালমান (রাঃ)এর সম্মুখে একটি কঠিন পাথর দেখা দিয়াছে যাহা তিনি ভাঙ্গিতে পারিতেছেন না।


 রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলিলেন, আমাকে সুযােগ দাও, আমিই উহার উপর সর্বপ্রথম আঘাত করিব। সুতরাং বিসমিল্লাহ বলিয়া তিনি উহাতে আঘাত করিলে উহার এক-তৃতীয়াংশ পরিমাণ একটি টুকরা ভাঙ্গিয়া পড়িয়া গেল। 

তিনি বলিলেন, আল্লাহু আকবার, কা'বার রবের কসম, সিরিয়ার মহলগুলি জয়লাভ হইবে। তিনি পুনরায় আঘাত করিলে আরাে এক টুকরা ভাঙ্গিয়া পড়িয়া গেল। 

তিনি বলিলেন, কা’বার রবের কসম, পারস্যের মহলগুলি জয়লাভ হইবে। এই সময় মুনাফিকগণ বলিল, নিজেদের আত্মরক্ষার জন্য আমাদেরকে খন্দক খনন করিতে হইতেছে, আর তিনি আমাদের সহিত পারস্য ও রােম বিজয়ের ওয়াদা করিতেছেন। (বিদায়াহ)


 হযরত জাবের (রাঃ) বলেন যে, তিনি সাড়ে তিনসের যবের আটা দ্বারা রুটি বানাইলেন এবং একটি বকরীর বাচ্চা জবাই করিয়া সালন পাক করিলেন। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দাওয়াত করিলেন। 

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খন্দকের সমস্ত লােকদের ডাকিয়া আনিলেন। তাহাদের সংখ্যা এক হাজার বা উহার কাছাকাছি ছিল। 


তাহারা সকলে সেই বকরীর বাচ্চা ও সামান্য পরিমাণ যবের রুটি দ্বারা পেট ভরিয়া খাইলেন, তারপরও খাবার যেমন ছিল তেমনই রহিয়া গেল।


হুনাইনের যুদ্ধে আনসারদের আত্মত্যাগ ও রাসূল (সাঃ) এর হৃদয় বিদারক ঘটনা

হুনাইনের যুদ্ধে আনসারদের আত্মত্যাগ  ও রাসূল (সাঃ) এর হৃদয় বিদারক  ঘটনা



Related search


সাহাবাদের জীবনী,

নবীদের জীবনী,

ইসলামিক গল্প,

হাদিসের উদ্ধৃতি, 

কুরআনের ঘটনা, 

ইসলামের ইতিহাস, 

ইসলামিক বই,

জান্নাত জাহান্নামে ঘটনা, 


হযরত আনাস (রাঃ) বলেন, হুনাইনের যুদ্ধের দিন হাওয়াযেন ও গাতফান ও অন্যান্য কাফের গােত্ৰসমূহ নিজেদের গৃহপালিত পশু ও সন্তান-সন্ততি সঙ্গে লইয়া আসিয়াছিল। (সে যুগে যাহারা যুদ্ধক্ষেত্র হইতে পলায়ন না করার দৃঢ় সংকল্প করিত তাহারা এরূপ করিত) 

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সহিত দশ হাজার মুসলমান ছিলেন এবং মক্কার সেই সকল (নওমুসলিম) লােকেরাও ছিল, যাহাদিগকে (ক্ষমা করিয়া দিয়া মুক্ত করিয়া দেওয়া হইয়াছিল এবং) তােলাকা বলা হইত।


যুদ্ধ আরম্ভ হইলে তাহারা ময়দান ছাড়িয়া পলায়ন করিল এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একা রহিয়া গেলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেদিন দুইটি পৃথক পৃথক ডাক দিয়াছিলেন। প্রথম তিনি ডান দিকে ফিরিয়া ডাক দিলেন, হে আনসারগণ ! আনসারগণ বলিলেন, লাব্বায়েক, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি সুসংবাদ গ্রহণ করুন, আমরা আপনার সহিত রহিয়াছি। 

অতঃপর বাম দিকে ফিরিয়া তিনি ডাক দিলেন, হে আনসারগণ! আনসারগণ বলিলেন, লাব্বায়েক, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি সুসংবাদ গ্রহণ করুন,আমরা আপনার সহিত রহিয়াছি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ও ওয়াসাল্লাম সাদা খচ্চরের পিঠে আরােহণ করিয়াছিলেন। 

তিনি উহা হইতে অবতরণ করিয়া বলিলেন, আমি আল্লাহর বান্দা ও তাঁহার রাসূল। অতঃপর মুশরিকগণ পরাজিত হইল। সেদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বহু গণীমতের মাল লাভ করিলেন। তিনি সমস্ত গণীমতের মাল মুহাজিরীন ও (মক্কার নওমুসলিম) তােলাকাদের মধ্যে বন্টন করিয়া দিলেন এবং আনসারগণকে উহা হইতে কিছুই দিলেন না।


আনসাগণ বলিলেন, যখন কোন কঠিন কাজের সময় হয় তখন আমাদিগকে ডাকা হয়, আর যখন গণীমতের মাল বন্টনের সময় হয়। তখন তাহা অন্যদের মধ্যে বন্টন করা হয়। আনসারদের এই কথা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কানে পৌঁছিল।

 তিনি তাহাদিগকে একটি তাঁবুতে সমবেত করিয়া বলিলেন, হে আনসারগণ, আমার নিকট এ কেমন কথা পৌছিয়াছে? আনসারগণ, চুপ করিয়া রহিলেন। অতঃপর তিনি বলিলেন, হে আনসারগণ, তােমরা কি ইহাতে সন্তুষ্ট নও যে, সকলে দুনিয়া লইয়া (ঘরে) যাইবে, আর তােমরা আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলকে তােমাদের ঘরে লইয়া যাইবে ?

 তাহারা বলিলেন, হা,আমরা সন্তুষ্ট আছি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলিলেন, যদি লােকেরা প্রান্তরের পথে চলে এবং আনসারগণ পাহাড়ী পথে চলে তবে আমিও আনসারদের পাহাড়ী পথে চলিব। 

বর্ণনাকারী হযরত হেশাম (রহঃ) বলেন, আমি (হযরত আনাস (রাঃ)কে বলিলাম, হে আবু হামযা, আপনি কি সে সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন? হযরত আনাস (রাঃ) বলিলেন, আমি কোথায় গায়েব হইব?

হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন, হুনাইনের যুদ্ধে গণীমতের বহু মালামাল লাভ হইবার পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাহা সম্পূর্ণই কোরাইশ ও আরবের সেই সকল (নওমুসলিম) লােকদের মধ্যে বন্টন করিয়া দিলেন, যাহাদের মন রক্ষা করার প্রয়ােজন দেখা দিয়াছিল।


 আনসারগণ উহা হইতে কম বেশী কিছুই পাইলেন না। ইহাতে তাহার মনে মনে অসন্তুষ্ট হইলেন এবং তাহাদের মধ্য হইতে কেহ বলিল, আল্লাহর কসম, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাে আপন কাওমের সাক্ষাৎ পাইয়া গিয়াছেন। (এখন তিনি মক্কায় থাকিয়া যাইবেন, মদীনায় আর ফিরিয়া যাইবেন না।) 

হযরত সা'দ ইবনে ওবাদাহ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আসিয়া বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, অনিসার গােত্রের মনে আপনার ব্যাপারে অসন্তোষ সৃষ্টি হইয়াছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলিলেন, কি কারণে? 

হযরত সা'দ (রাঃ) বলিলেন, আপনি গণীমতের সম্পূর্ণ মালামাল আপনার কওম ও অন্যান্য আরবদের মধ্যে বন্টন করিয়া দিলেন। আনসারগণ উহা হইতে কিছুই পাইল না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলিলেন, হে সা'দ, এই ব্যাপারে তােমার কি মতামত? তিনি বলিলেন, আমিও তাে আমার কাওমেরই এক ব্যক্তি।(অর্থাৎ কাওমের সহিত আমিও একমত।) 


রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলিলেন, তােমার কাওমকে আমার জন্য এই ঘেরাওয়ের ভিতর সমবেত কর। তাহারা সমবেত হইলে আমাকে সংবাদ দিও। হযরত সা'দ (রাঃ) বাহিরে আসিয়া আনসারদের মধ্যে ঘােষণা দিলেন এবং তাহাদের সকলকে উক্ত ঘেরাওয়ের ভিতর সমবেত করিলেন।

মুহাজিরীনদের মধ্য হইতে কয়েকজন আসিলে তাহাদিগকেও (ভিতরে প্রবেশের অনুমতি দিলেন। তাহারা ভিতরে প্রবেশ করিলেন। তারপর আরাে কয়েকজন আসিলে তাহাদিগকে হযরত সাদ (রাঃ) ফেরৎ দিলেন।

আনসারগণ সকলে সমবেত হইলে হযরত সা'দ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যাইয়া বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আপনি যেখানে আনসার গােত্রকে সমবেত করিতে বলিয়াছিলেন, তাহারা সেখানে সমাবেত হইয়াছে। 

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আসিলেন এবং তাহাদের মাঝে বয়ানের উদ্দেশ্যে দাঁড়াইলেন। আল্লাহ তায়ালার হামদ ও সানর পর বলিলেন, হে আনসারগণ, এমন নহে কি যে, আমি যখন তােমাদের নিকট আসিয়াছিলাম তােমরা পথভ্রষ্ট ছিলে, আল্লাহ তায়ালা তােমাদিগকে হেদায়াত দান করিয়াছেন। 

তােমরা সকলে অভাবগ্রস্থ ছিলে আল্লাহ তায়ালা তােমাদিগকে সচ্ছল করিয়াছেন, তােমরা পরস্পর শত্রু ছিলে আল্লাহ তায়ালা তােমাদের অন্তরসমূহকে মিলাইয়া দিয়াছেন? আনসারগণ (উত্তরে) বলিলেন, হা, এরূপই হইয়াছে।

 রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলিলেন, হে আনসারগণ তােমরা উত্তর কেন দিতেছ না? তাহারা বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, কি বলিব, আপনাকে কি উত্তর দিব? আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলেরই অনুগ্রহ।


 রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলিলেন, তােমরা ইচ্ছা করিলে বলিতে পার এবং তােমরা সত্য কথাই বলিবে এবং তােমাদিগকে সত্যবাদী বলা হইবে যে, আপনি লােকদের নিকট হইতে বিতাড়িত হইয়া আমাদের নিকট আসিয়াছিলেন, আমরা আপনাকে আশ্রয় দিয়াছি, আপনি অভাবগ্রস্থ ছিলেন, আমরা আপনাকে আর্থিক সাহায্য দিয়াছি ; আপনি ভীত-সন্ত্রস্ত ছিলেন, আমরা আপনাকে অভয় দিয়াছি । 

আপনি অসহায় ছিলেন, আমরা আপনার সহায়তা করিয়াছি। তাহারা বলিলেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)এরই অনুগ্রহ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলিলেন, তােমরা দুনিয়ার এই ঘাস-পাতার কারণে আমার উপর অসন্তুষ্ট হইতেছ? 

আমি তাে এই গনীমতের মালামাল নবাগত মুসলমানদিগকে তাহাদের মন রক্ষার্থে দিয়াছি, আর তােমাদিগকে ইসলামের ন্যায় মহান নেয়ামত যাহা আল্লাহ তায়ালা তােমাদের ভাগ্যে লিখিয়াছেন উহার সােপর্দ করিয়াছি। (গণীমতের মাল না পাইলেও তােমরা ইসলামের ন্যায় নেয়ামত লাভের উপর সন্তুষ্ট থাকিবে।)


 হে আনসারগণ, তােমরা কি ইহাতে সন্তুষ্ট নও যে, লােকেরা উট-বকরী লইয়া নিজেদের ঘরে ফিরে, আর তােমরা আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)কে লইয়া ঘরে ফিরিয়া যাও ? সেই পাক যাতের কসম, যাঁহার হাতে আমার প্রাণ, যদি লােকজন এক পাহাড়ী পথে চলে এবং আনসারগণ অন্য পাহাড়ী পথে চলে তবে আমি আনসারদের পথে চলিব। 

যদি হিজরত না হইত তবে আমি আনসারদের একজন হইতাম। আয় আল্লাহ, আনসারদের উপর এবং আনসারদের সন্তানদের উপর এবং তাহাদের সন্তানের সন্তানদের উপর রহমত নাযিল করুন।

হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা ও দোয়া শুনিয়া আনসারগণ কাঁদিতে লাগিলেন এবং কান্নায় তাহাদের দাড়ি ভিজিয়া গেল। 

তাহারা বলিলেন, আমরা আল্লাহকে রব্ব হিসাবে সন্তুষ্ট আছি এবং তাঁহার রাসূলের মালামাল বন্টনের উপর রাজী আছি। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখান হইতে ফিরিয়া আসিলেন এবং আনসারগণও চলিয়া গেলেন।



ইহুদীদের বিখ্যাত আলেম যায়েদ ইবনে সুনার ইসলাম গ্রহণের বিষ্ময়কর ঘটনা।

 ইহুদীদের বিখ্যাত  আলেম যায়েদ ইবনে সুনার ইসলাম গ্রহণের বিষ্ময়কর ঘটনা। 


Related search


সাহাবাদের জীবনী,

নবীদের জীবনী,

ইসলামিক গল্প,

হাদিসের উদ্ধৃতি, 

কুরআনের ঘটনা, 

ইসলামের ইতিহাস, 

ইসলামিক বই,

জান্নাত জাহান্নামে ঘটনা, 




 আল্লাহ তায়ালা যখন ইহুদি আলেম যায়েদ ইবনে সুনাকে যখন  হেদায়াত দিবেন তখন,   যায়েদ ইবনে সু'না নিজে নিজে  ভাবিতে লাগিলেন যে, হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রথম দেখেই, আমি নবুওয়াতের সকল নিদর্শন তাঁহার মধ্যে   পাইয়াছি। 

কিন্তু আমি দুইটি বিষয় এখনও অবগত হইতে পারি নাই। এক–নবীর ধৈর্য তাহার মূর্খতার উপর প্রবল হইবে। দুই—তাহার সহিত যতই মূর্খতাপূর্ণ আচরণ করা হইবে ততই তাঁর ধৈর্য বৃদ্ধি পাইবে।


একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের  হুজরা থেকে বাহিরে বের হলেন । তাঁহার সঙ্গে হযরত আলী ইবনে আবি তালেব (রাঃ) ছিলেন। এমন সময় তাঁহার নিকট একজন উদ্বারােহী আসিল। 

লােকটি দেখিতে বেদুইন মনে হইতেছিল। সে বলিল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! গ্রামে অমুক গােত্রে আমার কিছু সাথী ইসলাম গ্রহণ করিয়াছে। আমি তাদেরকে বলেছি যে, ইসলাম গ্রহণ করলে আল্লাহ  তাদের রিযিক বাড়িয়ে দিবেন।

 কিন্তু এখন তো সেখানে খুব অভাব দেখা দিয়াছে। ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমার আশঙ্কা হইতেছে যে, তাহারা যেমন রিযিকের লােভে ইসলাম গ্রহণ করিয়াছে, তেমনি আবার অন্য কোনো লােভের কারণে ইসলাম ছাড়িয়া না দেয়।

আপনি যদি ভালো  মনে করেন তবে তাদের জন্য কিছু সাহায্য করুন। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁহার পাশে দাঁড়ানাে ব্যক্তির প্রতি তাকাইলেন। আমার মনে হয় তিনি হযরত আলী(রাঃ) ছিলেন। 


উক্ত ব্যক্তি এই দৃষ্টির অর্থ বুঝিতে পারিয়া বলিলেন,ইয়া রাসুলাল্লাহ, সেই মালামালের কিছুই তাে এখন আর অবশিষ্ট নাই।যায়েদ ইবনে সুনা  বলেন, আমি তখন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকটবর্তী হইয়া বলিলাম, 

হে মুহাম্মাদ, আপনি এখনই নগদ মূল্য গ্রহণ করিয়া অমুকের বাগানের এই পরিমাণ খেজুর এই তারিখের মধ্যে  পরিশােধ করার শর্তে আমার কাছে  বিক্রয় করিবেন কি? তিনি বলিলেন, কারো বাগান নির্দিষ্ট করিয়া বলিও  না।

 আমি বলিলাম, ঠিক আছে, তাহাই হইবে। অতএব তিনি রাজি  হলেন এবং আমি আশি মিসকাল স্বর্ণ  তাঁহাকে প্রদান করিলাম। তিনি সব মুদ্রা  আগত ব্যক্তিকে দিয়া দিলেন এবং  বলিলেন, এগুলো  দিয়ে সবার  সাহায্য কর এবং সবাই কে ভাগ করে দিও।


হযরত যায়েদ ইবনে সুনা (রাঃ) বলেন, নির্দিষ্ট মেয়াদের দুই তিনদিন আগে  রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন হযরত আবু বকর (রাঃ),সাথে  হযরত ওমর (রাঃ) এবং  হযরত ওসমান (রাঃ) সহ আরো অন্যান্য সাহাবীদের নিয়ে একটা  জানাযার নামায পড়ালেন। 

নামাযের পর তিনি যখন একটি দেয়ালের পাশে বসিবার জন্য অগ্রসর হইলেন তখন আমি তাঁর  জামা ও চাদর ধরে অত্যন্ত রাগান্বিত হয়ে তাঁহার প্রতি চাহিলাম এবং বলিলাম, হে মুহাম্মাদ,আপনি কি আমার পাওনা পরিশােধ করিবেন না? খােদার কসম, তােমরা আবদুল মুত্তালিবের বংশ শুধু টালবাহানাই করিতে শিখিয়াছ।

 এমন সময় হযরত ওমর (রাঃ)এর প্রতি আমার চোখ পড়িতেই আমি দেখলাম  যে, রাগে তার চোখ বড় হয়ে  গােল আকাশের ন্যায় ঘুরতেছে।  তিনি আমার প্রতি চোখ বড় বড় করে তাকালেন এবং বলিলেন, “ওরে আল্লাহর  দুশমন,তুই আল্লাহর রাসূলকে কি  কথা বলিতেছিস যাহা আমি শুনিতেছি? 


আর তাহার সহিত এমন ব্যবহার করিতেছিস যাহা আমি দেখিতেছি? সেই পাক যাতের কসম, যাহার  হাতে আমার জীবন , যদি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর  মজলিসের আদবের কথা  না ভাবতাম তবে  আমার তলােয়ার দিয়ে এখনই তাের গর্দান উড়াইয়া দিতাম।

অপরদিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যন্ত শান্তসৌম্য দৃষ্টিতে আমার প্রতি চাহিয়া রহিলেন এবং (হযরত ওমর(রাঃ) এর কথা শুনিয়া) বলিলেন, হে ওমর! আমার ও তাহার ইহা অপেক্ষা অন্যকিছুর অধিক প্রয়ােজন ছিল। 

আমাকে তুমি ঠিক ভাবে  ঋণ পরিশােধের কথা বলিতে এবং তাকে বলতে সে যেন  ভালো করে তার  দাবী জানায়।  হে ওমর, তাহাকে লইয়া যাও এবং তাহার পাওনা দিয়া দাও।

আর তোমার  ভয় দেখানোর কারনে তাকে বিশ সা’ খেজুর বেশি  দিবে। হযরত যায়েদ (রাঃ) বলেন, হযরত ওমর (রাঃ) আমাকে লইয়া গেলেন এবং আমার পাওনা খেজুর দেওয়ার  পর আরো   বিশ সা’ খেজুর বেশি  দিলেন।


 আমি বলিলাম, হে ওমর! এই গুলো কেন দিলেন? তিনি বলিলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে আদেশ করিয়াছেন যে, আমি তােমাকে ভয় দেখানোর কারনে আরো অতিরিক্ত খেজুর যেন তোমাকে দেই ।

 আমি বলিলাম, হে ওমর! আপনি কি আমাকে চিনিতে পারিতেছেন? হযরত ওমর (রাঃ) বলিলেন, না। বলিলাম, আমি যায়েদ ইবনে সুনা। তিনি বলিলেন, ইহুদীদের সেই বড় আলেম? আমি বলিলাম, হাঁ, সেই বড় আলেম।

 তিনি বলিলেন, তুমি তো অনেক  বড় আলেম তাহলে তুমি  রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে এমন ব্যবহার কেন করিলে? তাঁহাকে এইরূপ কথা কেন বলিলে? 

আমি বলিলাম, হে ওমর! আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চেহারা মুবারক দেখিয়াই  উহার মধ্যে নবুওয়াতের সব নিদর্শন চিনতে পারিয়াছি।


 কিন্তু আমি দুইটি বিষয়ে নিশ্চিত হইতে পারি নাই। এক–নবীর ধৈর্য তাঁহার মূর্খতার উপর প্রবল হইবে। দুই—তাহার সহিত যতই মূর্খতাপূর্ণ আচরণ করা হইবে ততই তাঁহার ধৈর্য বৃদ্ধি পাইবে। 

আর এই দুইটাই আমি এখন যাচাই বাছাই  করে বুঝতে পেড়েছি যে উনি সত্য নবী । হে ওমর, আমি আপনাকে সাক্ষী রাখে  বলিতেছি যে, আমি ইসলাম কবুল করলাম । আর আমি আপনাকে সাক্ষী রাখিয়া বলিতেছি যে, আমি মদীনায় সর্বাপেক্ষা ধনী ব্যক্তি। 

সুতরাং আমার অর্ধেক মাল হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সকল উম্মতের জন্য দান করিয়া দিলাম। হযরত ওমর (রাঃ) বলিলেন, সকল উম্মত না বলে, বল উম্মতের কিছু অংশের জন্য , কারণ তােমার জন্য সকল উম্মতকে দেওয়া সম্ভব নয়। 


আমি বলিলাম, ঠিক আছে, উম্মতের কিছু অংশের জন্য দান করিলাম। তারপর  তারা  সেখান হইতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে আসিলেন, এবং যায়েদ ইবনে সু'না কালেমা শাহাদাত পাঠ করলেন। 

তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর ঈমান আনলেন, এবং  তাঁহাকে সত্য নবী বলিয়া মেনে নিলেন  এবং বাইআত হইলেন। 

তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সহিত বহু জেহাদে অংশগ্রহণ করিয়াছেন। অবশেষে তকূকের যুদ্ধেযাওয়ার সময়  তিনি ইন্তেকাল করেন। আল্লাহ তায়ালা হযরত যায়েদের প্রতি রহমত নাযিল করুন।

হযরত ওয়াহশী ইবনে হারব (রাঃ)এর ইসলাম গ্রহণের ঘটনা

 হযরত ওয়াহশী ইবনে হারব (রাঃ)এর ইসলাম গ্রহণের ঘটনা


Related search


সাহাবাদের জীবনী,

নবীদের জীবনী,

ইসলামিক গল্প,

হাদিসের উদ্ধৃতি, 

কুরআনের ঘটনা, 

ইসলামের ইতিহাস, 

ইসলামিক বই,

জান্নাত জাহান্নামে ঘটনা, 



 রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, হযরত হামযা (রাঃ) এর হত্যাকারী ওয়াহশী ইবনে হারব( রাঃ)এর নিকট ইসলামের দাওয়াত দিয়ে একজনকে  পাঠালেন। 

ওয়াহশি বার্তা বাহকের নিকট  জবাব দিলেন  যে, হে মুহাম্মাদ, আপনি আমাকে কিভাবে দাওয়াত দিতেছেন? আপনিতো বলেন, যে ব্যক্তি মানুষ  হত্যা করে, শিরক করে অথবা যেনা করে, সে জাহান্নামে  যাবে, কেয়ামতের দিন তাদের শাস্তি বাড়িয়ে দ্বিগুণ করা হবে এবং জাহান্নামে  সে  চিরকাল থাকবে।

 আর আমি তো এই সকল কাজ করেছি। আপনার নিকট আমার জন্য শাস্তি হইতে পরিত্রাণের কোন পথ আছে কি? 


আল্লাহ তায়ালা তাহার এই প্রশ্নের উত্তরে নিম্নের আয়াত নাযিল করিলেন-

অর্থ ঃ কিন্তু যে ব্যক্তি তওবা করিয়াছে এবং ঈমান আনিয়াছে ও নেক আমল করিয়াছে। এই সকল লােকদের গুনাহগুলিকে আল্লাহ তায়ালা নেকী দ্বারা পরিবর্তন করিয়া দিবেন। আর আল্লাহ তায়ালা অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও অতিশয় দয়াবান।


অতঃপর ওয়াহশী (রাঃ) এই আয়াত শুনে বলিলেন, তওবা করা , ঈমান আনা ও নেক আমলের এই গুলো  তো বড় কঠিন কাজ মনে হইতেছে।  আমি উহা হয়ত ঠিক মত পালন করতে সক্ষম হইব না। 


তার এই কথার পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তায়ালা এই আয়াত নাযিল করিলেন—

অর্থ : আল্লাহ তায়ালা শিরক গুনাহ মাফ করবেন না, তবে শিরক ব্যতীত সকল গুনাহ যাকে চাহেন মাফ করে দিবেন।

হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) বার্তা বাহকে এই আয়াত নিয়ে আবারও  পাঠালেন। 

ওয়াহশী (রাঃ) যখন কুরআনের এই আয়াত শুনলেন তখন তিনি বললেন, হে মুহাম্মাদ,  আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছা করলে মাফ করতেও পারেন আবার নাও করতে পারেন এটা তো আল্লাহর  উপর নির্ভরশীল হইল।  তিনি আমাকে মাফ করবেন কিনা, আমার জানা নাই ? ইহা ছাড়া আর কোন পথ আছে কি? 


সুতরাং আল্লাহ তায়ালা এই আয়াত নাযিল করিলেন--

অর্থ ঃ হে আমার বান্দাগণ, যাহারা নিজেদের উপর জুলুম করিয়াছ, তােমরা আমার রহমত হইতে নিরাশ হইও না, নিশ্চয় আল্লাহ সমস্ত গুনাহ মাফ করেন। নিশ্চয় তিনি বড় ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।

হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) বার্তা বাহকে এই আয়াত নিয়ে পাঠালেন, 

যখন ওয়াহশী  এই আয়াত শুনিলেন তখন বলিলেন,  এখন ঠিক আছে। অতএব তিনি মুসলমান হয়ে গেলেন, সুবহানাল্লাহ।

 আল্লাহ যাকে চান তাকেই হেদায়েত দান করেন।আল্লাহ সবকিছু করতে পারেন। আল্লাহ তায়ালা মহান, দয়ালু, অত্যন্ত ক্ষমাশীল।